
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি যদি চান যে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে যান, তাহলে তিনি থাকবেন। আর যদি দলটি না চায়, তাহলে তিনি নিজ উদ্যোগেই সম্মানজনকভাবে সরে যাবেন। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটির প্রথম অংশ প্রকাশের পর শেষ অংশ আজ প্রকাশিত হয়েছে।
বিদেশি গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর তিনি আর দায়িত্বে থাকতে চান না—এমন বক্তব্য নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, তার কথাবার্তা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি যেভাবে কথাটা বলেছিলাম, সেটি সেই সময়ের প্রেক্ষাপটেই বোঝা দরকার। গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আমাকে যেভাবে মানসিক চাপের মধ্যে রেখেছে, বিভিন্ন ঘটনায় আমাকে অপমানিত করা হয়েছে, তা আমার মনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। সেই অবস্থায়ই আমি বলেছিলাম, এভাবে রাষ্ট্রপতি থাকা যায় না, চলে যেতে ইচ্ছা করে।”
রাষ্ট্রপতি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনটি একপর্যায়ে জনবিস্ফোরণে রূপ নেয়। সেদিন কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কেউই আগে থেকে পুরোপুরি আঁচ করতে পারেনি।
তিনি বলেন, যখন বিক্ষোভকারীরা গণভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তাকে জানানো হয় যে প্রধানমন্ত্রী যে কোনো মুহূর্তে বঙ্গভবনে আসতে পারেন। দুপুর ১২টার দিকে জানানো হয়, তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর আগে পরিস্থিতির ভয়াবহতা পুরোপুরি অনুমান করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন বলা হচ্ছিল এবং হেলিকপ্টার প্রস্তুত থাকার খবরে ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সবাই তখন নিজ নিজ অবস্থান নেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আবার জানানো হয় যে প্রধানমন্ত্রী আর আসছেন না। কিছু সময় পর জানা যায়, তিনি দেশ ছেড়ে গেছেন। সব মিলিয়ে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে প্রথমে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাকে ফোনে সব ঘটনা জানান। পরে সশস্ত্র বাহিনীর অন্যান্য শাখা থেকেও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। এরপর জানানো হয় যে সেনাপ্রধান সাংবাদিকদের সামনে পুরো পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিং দেবেন।
সেনাপ্রধানের ব্রিফিং টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়, যেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন বলে জানান। এতে দেশবাসী কিছুটা আশ্বস্ত হয়। পরে সেনাপ্রধান আবার ফোন করে জানান যে তিনি আসছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধান—তিনজনই বঙ্গভবনে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, তখন পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত। কী করা যায়, কীভাবে দেশকে স্থিতিশীল রাখা যায়—এসব বিষয় নিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা আলোচনা চলে। পরে সিদ্ধান্ত হয়, সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের ডাকা হবে। সেনাবাহিনীর একটি টিম এই দায়িত্ব পালন করে। সেনা সদরে রাজনৈতিক দলের নেতাদের একত্র করা হয়, যেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন প্রতিনিধিও ছিলেন। যাদের পাওয়া গেছে, তাদের নিয়েই আবার বঙ্গভবনে বৈঠক হয়।
রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি বলেন, কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে জনগণ স্বস্তি পাবে—সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার—এই তিনটি প্রস্তাব উঠে আসে।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, নানা বিবেচনায় রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্ত নেন যে অন্তর্বর্তী সরকারই সবচেয়ে উপযুক্ত পথ। এই সিদ্ধান্তের পর তার ওপর দায়িত্ব পড়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার। রাত ১১টায় তিনি ভাষণ দেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সেনাবাহিনীর আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।