
ইরানের চলমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘পরিবর্তনশীল’ উল্লেখ করে দেশটিতে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে ভারত সরকার। তেহরানে অবস্থিত Embassy of India, Tehran এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানে থাকা শিক্ষার্থী, তীর্থযাত্রী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের বাণিজ্যিক ফ্লাইটসহ যেকোনো উপলব্ধ পরিবহন ব্যবস্থায় দ্রুত দেশ ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
দূতাবাসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিক ও ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে বিক্ষোভ, সমাবেশ বা রাজনৈতিক জমায়েতের স্থান এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সবাইকে দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইতালি, পোল্যান্ড, জার্মানি ও স্পেনসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশও তাদের নাগরিকদের ইরান ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিল। সে সময় ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান ব্যাপকভাবে কমে গিয়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় এক লাখ ৪৪ হাজারে নেমে আসে। এর পর থেকেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জোরদার হয় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে দুই দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় আরেক দফা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই বৈঠকে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করবেন।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump একটি ‘অর্থবহ চুক্তি’ সম্পাদনের জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতা না হলে এর পরিণতি হতে পারে। যদিও তিনি সরাসরি কোনো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেননি, তবে তার বক্তব্যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এদিকে ইরান কর্তৃপক্ষ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থেকে সরে না আসার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। তেহরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তারা নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম The New York Times জানিয়েছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক বিকল্প বিবেচনা করতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। ভারত সরকারের এই পরামর্শও সেই প্রেক্ষাপটেই দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বর্তমানে ইরানে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ সেখানে অবস্থান করছেন। দূতাবাস জানিয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে নাগরিকরা সরাসরি দূতাবাসের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করতে পারবেন।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে। তবে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে নয়াদিল্লি।