
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর পদে পরিবর্তন এনেছে সরকার। এ পদ থেকে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামকে সরিয়ে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামকে। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগের শীর্ষ পদে নতুন দায়িত্বে নিয়োগ পাচ্ছেন অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। একই সঙ্গে পূর্বের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। তবে প্রজ্ঞাপনে এই পরিবর্তনের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
নতুন চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে খালেদা জিয়া-এর আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও আলোচিত একাধিক মামলায় তার আইনি ভূমিকা তাকে পরিচিত করে তোলে।
এছাড়া ২০০৯ সালের বহুল আলোচিত বিডিআর হত্যাকাণ্ড মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে তার ভূমিকার কারণে জাতীয় পর্যায়েও তিনি পরিচিতি লাভ করেন। আইন পেশায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলায় অংশগ্রহণের কারণে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন আইন অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামকে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এ তার এই নিয়োগ দিয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়। জুলাই আন্দোলনে সারাদেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, প্রাথমিক তদন্ত এবং মামলার প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছিল। তবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ছয় মাসের মধ্যেই তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, যা আইন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
আইন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, প্রসিকিউশন টিমের কাঠামো নতুন করে সাজানোর অংশ হিসেবেই এই রদবদল হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে। জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, গুম ও হত্যার অভিযোগগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে মামলার প্রস্তুতি ও বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের একটি সংবিধানিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বিচারিক প্রতিষ্ঠান। অতীতে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা আবারও আলোচনায় এসেছে।
চিফ প্রসিকিউটর পদে এই পরিবর্তন ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আইন অঙ্গন ও রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে নতুন সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদে এই রদবদল চলমান বিচারিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।