
দেশি ও বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির কাছে বিপুল অঙ্কের বকেয়া নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই অবস্থায় রমজানের পর সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠতে পারে। এই চাহিদা মেটাতে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখার পরিকল্পনার কথা জানালেও বাস্তবতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি সামাল দিতে আপাতত তার ভাষায় ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ করতে হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাত কার্যত আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। বিপুল বকেয়া, জ্বালানি সংকট এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কাটাতে গিয়ে সরকারকে অত্যন্ত হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ জ্বালানি আমদানি সরাসরি দেশের ডলার মজুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, গ্রীষ্মকালে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৩৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আমদানি সক্ষমতা যুক্ত করে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯৪ লাখ। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই, সেদিন উৎপাদন হয়েছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানায়, বকেয়ার বড় অংশ জমেছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে। শুধু এই খাতেই বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তারা গত সাত থেকে আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পাচ্ছেন না।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বলেন, শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই বকেয়া জমতে জমতে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। সরকার থেকে যে ভর্তুকি পাওয়া যায়, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় ঘাটতি আরও বেড়েছে।
বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিপপা সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। তাদের দাবি, তেল আমদানির জন্য এলসি খুলতে সময় লাগে ৪০ থেকে ৪৫ দিন। এর মধ্যে বিল পরিশোধে জটিলতা থাকলে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে জ্বালানি সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশই গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। পাশাপাশি কয়লা ও তেল প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, যদি পুরোপুরি জ্বালানি আমদানি নির্ভর উৎপাদন চালানো হয়, তাহলে বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে বের হতে হলে বিদ্যুতের ভর্তুকি কাঠামো, তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ব্যবহার, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের মতো বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ খাতে বিপুল বকেয়া ও জ্বালানি সংকট নতুন সরকারের জন্য বড় আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে কীভাবে এই সংকট সামাল দেওয়া যায়, সেদিকেই এখন সরকারের নজর।