
মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনীর এক অভিযানে নিহত হয়েছেন দেশটির মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী এবং জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল (সিজেএনজি)–এর প্রধান নেমেসিও ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত। মেক্সিকো সরকার জানিয়েছে, জালিস্কো রাজ্যের তাপালপা এলাকায় পরিকল্পিত সামরিক অভিযানে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান।
রবিবার তাকে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার সময় তার অনুগতদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি হয়। ওই সংঘর্ষে সিজেএনজির চার সদস্য নিহত হয় এবং তিনজন সেনা সদস্য আহত হন। অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বলে জানানো হয়েছে।
৫৯ বছর বয়সী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এল মেনচো দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী অপরাধ চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তার সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ কোকেন, মেথামফেটামিন ও ফেন্টানাইল পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার তথ্যের জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বিশেষ বাহিনীর সুপরিকল্পিত অভিযানে মেক্সিকান বিমান বাহিনী ও ন্যাশনাল গার্ডের বিমান মোতায়েন করা হয়। অভিযানের সময় বেশ কয়েকটি সাঁজোয়া যান ও রকেট লঞ্চারসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সিজেএনজি বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা চালায়। আটটি রাজ্যে গাড়িতে আগুন, সড়ক অবরোধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা আসন্ন FIFA World Cup–এর আয়োজক শহরগুলোর একটি গুয়াদালাজারাসহ একাধিক শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পান।
জালিস্কো উপকূলের পর্যটনকেন্দ্র পুয়ের্তো ভাল্লার্তায় অস্থিরতার কারণে বহু পর্যটক রিসোর্টে আটকা পড়েন। জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস নাভারো বাসিন্দাদের ‘কোড রেড’ সতর্কতা মেনে চলার আহ্বান জানান এবং ঘরে অবস্থান করার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, রাজ্যে গণপরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জালিস্কো ও তামাউলিপাসসহ মিচোয়াকান, গুয়েরেরো এবং নুয়েভো লিওনের কিছু এলাকায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে।
সহিংসতার জেরে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও প্রভাব পড়ে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স, আমেরিকান এয়ারলাইন্স ও এয়ার কানাডা পুয়ের্তো ভাল্লার্তা এবং গুয়াদালাজারার ফ্লাইট বাতিল করে। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং সাইটের তথ্য অনুযায়ী, আটলান্টা থেকে গুয়াদালাজারাগামী ডেল্টা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটকে অস্টিনে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
মেক্সিকোয় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এল মেনচোকে “সবচেয়ে রক্তাক্ত ও নিষ্ঠুর মাদক সম্রাটদের একজন” হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এ মৃত্যু মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বৃহত্তর অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে কার্টেলের সহিংস প্রতিক্রিয়া প্রশাসনের সাফল্যকে ম্লান করতে পারে।
জালিস্কো কার্টেল নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ধারাবাহিক হামলার জন্য কুখ্যাত। অতীতে তারা রকেটচালিত গ্রেনেড দিয়ে একটি সেনা হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছিল এবং বহু কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখাতে সহিংসতার প্রদর্শনও তাদের কৌশলের অংশ ছিল।
২০১০ সালে জালিস্কোতে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলা সিজেএনজি বর্তমানে মেক্সিকোজুড়ে সক্রিয়। মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এটিকে শক্তিশালী সিনালোয়া কার্টেলের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। ফেন্টানাইল উৎপাদন ও পাচার থেকে সংগঠনটি বিপুল অর্থ উপার্জন করত।
২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার পেট্রোলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৯ হাজার ২০০ পাউন্ড (৪ হাজার ১৮২ কেজি) ফেন্টানাইল জব্দ করা হয়েছে। এর ৯৬ শতাংশই মেক্সিকোর দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে আটক হয়।
সব মিলিয়ে এল মেনচোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মেক্সিকোর মাদকবিরোধী লড়াইয়ে একটি বড় অধ্যায় শেষ হলেও, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।