
রাজধানীর মিরপুরের কল্যাণপুরে ‘জাহাজবাড়ি’ নামে পরিচিত একটি বাড়িতে ২০১৬ সালের অভিযানে ৯ তরুণ নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় নতুন আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ছয় পলাতক আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৮ মার্চ।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান।
আদালত সূত্রে জানা যায়, এ মামলায় মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া। বাকি ছয়জন আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের আত্মসমর্পণের জন্য জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, তৎকালীন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় এবং তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন।
এর আগে, গত ২৯ জানুয়ারি আট আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরে কথিত জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৯ তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি সে সময় ‘অপারেশন স্ট্রম-২৬’ নামে পরিচিত ছিল।
ওই অভিযানে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট অংশ নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি ছিল, নিহতরা জঙ্গি সংগঠনের সদস্য এবং বন্দুকযুদ্ধে তারা মারা যায়। তবে পরবর্তীতে এ ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সংঘটিত করা হয়েছিল এবং এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা আত্মসমর্পণ না করলে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ একটি প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া। এতে আদালত নিশ্চিত করে যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও আইনসম্মতভাবে এগোচ্ছে এবং তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এ মামলার অগ্রগতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, আসামিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা রয়েছেন। ফলে মামলার কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ শুনানিকে ঘিরে জনমনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আগামী ৮ মার্চ নির্ধারিত শুনানিতে আত্মসমর্পণ সংক্রান্ত অগ্রগতি এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে আদালতে পরবর্তী আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।