
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব। দেশের ভোটারদের দৃষ্টি এখন এই সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার দিকে।
এক ওয়েবিনারে বক্তারা উল্লেখ করেছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রধান অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাই নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার মূল মানদণ্ড। ‘কাউন্টার পয়েন্ট’-এর সম্পাদক জাফর সোবহান বলেন, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিই আন্দোলনের অন্যতম কারণ ছিল, যা পূর্ববর্তী সরকারের পরিবর্তনের পথ সুগম করেছিল। নতুন সরকার শুরুতে জনসমর্থনের সুবিধা পাবেও তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তিনি আর্থিক স্থিতিশীলতা, টাকার মান রক্ষায় এবং খেলাপি ঋণ হ্রাসে গুরুত্বারোপ করেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয়ী হয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পেয়েছে।
International Monetary Fund-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪.২ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৫.৮ শতাংশ। বৈশ্বিক সংকট, যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে। চলতি ও পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ওয়েবিনারের আলোচনায় বলা হয়, নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান–এর অভিজ্ঞতা দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদ আখতার বলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সমন্বয় আছে, যা নীতি ও কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রেটিং সংস্থা Moody's জানিয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পোশাক খাতে বিক্ষোভ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে। বিনিয়োগের পরিবেশ এখনও অনিশ্চিত হলেও ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার, সংসদীয় কার্যক্রমে অগ্রগতি এবং বিনিময় হার নমনীয় করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকস মতে, বিএনপি বাজারমুখী নীতি বজায় রাখলেও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর রপ্তানিতে প্রায় ১৪ শতাংশ প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে এলডিসি মর্যাদার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার পর ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগ নেবেন। পূর্বে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছিল, তবে বর্তমানে সহযোগিতার সম্ভাবনা উন্মুক্ত।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি—এই চারটি ক্ষেত্রেই নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে। এই উদ্যোগগুলো আগামী দিনের রাজনীতিতে দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে প্রভাবিত করবে।