
স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ কিছুটা সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগকে সঠিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি উত্তরণ দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারত। একই সঙ্গে শ্রমিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সরকারের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ী মহলের দাবি, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় একাধিক সমস্যা তৈরি হয়েছে, যা এখন নবগঠিত বিএনপি সরকারকে সমাধান করতে হবে। তাদের মতে, নীতিনির্ধারণে অংশীজনদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করায় ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নীতিনির্ধারণে সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করেনি। ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করা হয়েছে। এক ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাস্তবে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে এর মাশুল দিতে হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই দিক থেকেই একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে জাতিসংঘে চিঠি পাঠিয়েছে বর্তমান সরকার। এই পদক্ষেপ ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি ফিরিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে করে রপ্তানি খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা আরও কিছু সময় ধরে পাওয়া যাবে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকে তারা স্বাগত জানাচ্ছেন। তার মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ হলে পোশাক খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।
একইভাবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। অতীতে বাস্তব অবস্থার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভালো দেখানো হয়েছে, যা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময় চাওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নির্ধারিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা রয়েছে। এলডিসি উত্তরণ কর্মকৌশল বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এলডিসিতে কারা থাকবে এবং কারা উত্তরণ করবে—তা নির্ধারণ করে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তাদের বৈঠক রয়েছে, যেখানে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞ সদস্যদের দূরদর্শী কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে নেওয়া সম্ভব। বিকেএমইএর সভাপতি এ প্রসঙ্গে বলেন, অতীতে যেমন পাট খাত ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তেমনি ভুল নীতির কারণে পোশাক শিল্পও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এই জটিলতা দূর করা গেলে এলডিসি উত্তরণ বিলম্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।