
ভারতে শিশু সুরক্ষার ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন রায়ে এক দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এক দশক ধরে ৩৩টি শিশুকে পাশবিক যৌন নির্যাতন এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রির দায়ে এ সাজা ঘোষণা করা হয়। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) উত্তর প্রদেশের বান্দার পকসো আদালতের অতিরিক্ত জেলা জজ পি কে মিশ্র এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।
বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে অপরাধটিকে ‘বিরল থেকে বিরলতম’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দণ্ডিতদের সংশোধনের কোনো বাস্তব সুযোগ নেই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে কঠোর বার্তা দিতে সর্বোচ্চ সাজাই একমাত্র উপযুক্ত সিদ্ধান্ত বলে মত দেন তিনি। দণ্ডিত দম্পতি হলেন উত্তর প্রদেশের জলকল বিভাগের সাবেক জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার রাম ভবন (৫০) এবং তাঁর স্ত্রী দুর্গাবতী (৪৭)।
আদালত ও মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর ধরে বান্দা ও চিত্রকূট জেলার বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে ১৩ বছর বয়সী অন্তত ৩৩ শিশুকে নির্যাতনের শিকার করেন এই দম্পতি। শিশুদের অনলাইন ভিডিও গেম খেলার প্রলোভন, টাকা ও উপহারের লোভ দেখিয়ে তারা নিজেদের ফাঁদে ফেলত। পরে নির্যাতনের ভিডিও ও স্থিরচিত্র ইন্টারনেটের গোপন জগত—ডার্ক ওয়েব—ব্যবহার করে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে মোটা অংকের বিনিময়ে বিক্রি করা হতো।
দীর্ঘদিনের এই নির্যাতনের ফলে বহু শিশুর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি অপূরণীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। তদন্তে উঠে আসে, কয়েকজন শিশুর চোখে স্থায়ী ট্যারাভাব তৈরি হয় এবং কারও কারও যৌনাঙ্গে গুরুতর ক্ষত হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ভুক্তভোগীদের মানসিক ট্রমা মোকাবিলায় চিকিৎসকদের বিশেষ সহায়তা নিতে হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ভয়াবহ এই অপরাধ চক্র প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০২০ সালে। ডার্ক ওয়েবে শিশু নির্যাতনের কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল-এর নজরে আসার পর তারা ভারত সরকারকে সতর্ক করে। ইন্টারপোলের তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তে নামে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই।
সিবিআই ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর এ ঘটনায় একটি এফআইআর দায়ের করে। পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারিতে দম্পতির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তদন্ত চলাকালে ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণ, ডার্ক ওয়েবের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য এবং ভুক্তভোগী শিশুদের সাহসী সাক্ষ্যই মামলাটি প্রমাণের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
আদালত দম্পতিকে পকসো আইন ও ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রতিটি ভুক্তভোগী শিশুকে ১০ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা উত্তর প্রদেশ সরকারকে প্রদান করতে বলা হয়েছে।
বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি কমল সিং গৌতম জানান, ভুক্তভোগী শিশুরা এখনও সেই ভয়াবহ স্মৃতির ট্রমা বহন করছে। তাঁর মতে, এই রায় শিশুদের সুরক্ষায় ভারতের বিচার ব্যবস্থার একটি কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা। আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ রায় ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলোতে দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।