নীল আকাশের পটভূমিতে সাদা ও সোনালি রঙের বিশাল গম্বুজ আর আকাশছোঁয়া মিনার—এক নজর দেখলেই মনে হয় আরব বিশ্বের কোনো রাজকীয় স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাস্তবে এটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য ধর্মীয় নিদর্শন। কথা হচ্ছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া গ্রামে অবস্থিত গুঠিয়া মসজিদ কমপ্লেক্স, যার আনুষ্ঠানিক নাম বায়তুল আমান জামে মসজিদ।
এই মসজিদের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো—এর নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছে পবিত্র মক্কা, মদিনা, কারবালা ও ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন পুণ্যভূমির মাটি। ফলে মসজিদটি শুধু একটি ইবাদতকেন্দ্র নয়, বরং মুসলমানদের কাছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে।
২০০৩ সালে এই মসজিদ কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০০৬ সালে তা সম্পন্ন হয়। প্রায় ২০ একর বিস্তৃত জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্সে রয়েছে মূল মসজিদ, এতিমখানা, মাদ্রাসা এবং বিশাল জলাধার। পরিকল্পিত স্থাপত্য ও পরিবেশবান্ধব নকশার কারণে পুরো এলাকা একটি সমন্বিত ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
স্থাপত্যের দিক থেকে গুঠিয়া মসজিদ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম। এতে রয়েছে মোট ২১টি গম্বুজ এবং ১৯৩ ফুট উচ্চতার একটি মিনার। আধুনিক নির্মাণশৈলীর সঙ্গে ইসলামী ক্যালিগ্রাফি ও ঐতিহ্যবাহী নকশার চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যায় পুরো কাঠামোজুড়ে। ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে দামি পাথরে মোড়ানো দেয়াল, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং প্রশস্ত নামাজকক্ষ। একসঙ্গে প্রায় দেড় হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।
শুধু ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরাই নন, স্থাপত্যপ্রেমী ও পর্যটকরাও প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে গুঠিয়া মসজিদ দেখতে আসেন। ঢাকার যাত্রাবাড়ি থেকে আসা দর্শনার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, “অনেক দিন ধরেই এই মসজিদের নাম শুনে আসছি। সামনে এসে দেখে মনে হচ্ছে আরব বিশ্বের কোনো শহরে দাঁড়িয়ে আছি।”
আরেক দর্শনার্থী ইসমাইল জানান, “ছবিতে মসজিদটি যতটা সুন্দর লেগেছিল, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি সুন্দর। বিশেষ করে গম্বুজ আর মিনারের নকশা অসাধারণ।”
মসজিদের ইমাম সিদ্দিকুর রহমান জানান, এই মসজিদ নির্মাণের আগে প্রকৌশলীদের বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখানো হয়েছিল, যাতে নকশা অন্য সব মসজিদ থেকে আলাদা হয়। তার ভাষায়, “এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স। এখানে এতিমখানা ও মাদ্রাসাও রয়েছে, যার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করছেন মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা।”
দিনের আলোয় গুঠিয়া মসজিদ যতটা মনোমুগ্ধকর, রাতের আলোকসজ্জায় এর সৌন্দর্য ততটাই বহুগুণে বেড়ে যায়। আলো-ছায়ার খেলায় গম্বুজ ও মিনার যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এ কারণে সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও বেড়ে যায়।
বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন জানিয়েছেন, গুঠিয়া মসজিদকে কেন্দ্র করে আশপাশের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গাসাগর ও বানারীপাড়ার শের-ই বাংলা একে ফজলুল হকের বাড়ির সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকাটিকে আরও পর্যটকবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, গুঠিয়া মসজিদ শুধু বরিশালের নয়, বরং বাংলাদেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ও স্থাপত্য নিদর্শন। পবিত্র ভূমির মাটি, নান্দনিক নকশা ও শান্ত পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে এটি আজ বিশ্বাস, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনস্থল।
