
গত বর্ষা মৌসুমের টানা বৃষ্টি ও জমিতে দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতার প্রভাবে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ফুল চাষে বড় ধরনের ধস নেমে এসেছে। সময়মতো চারা রোপণ ও পরিচর্যা করতে না পারায় এ বছর ফুলের ফলন আশানুরূপ হয়নি। ফলে বিপুল বিনিয়োগ করেও লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় ফুলচাষিরা।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলা-এর কলাগাছিয়া ইউনিয়নে গিয়ে এই সংকটের চিত্র দেখা যায়। শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ঘেঁষা এই ইউনিয়নের সাবদি, দীঘলদি, মাধবপাশাসহ অন্তত দশটি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হয়ে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই যুগ ধরে এসব গ্রামে সাড়ে পাঁচশ বিঘার বেশি জমিতে ফুল চাষ করা হচ্ছে।
এ অঞ্চলে গাঁদা, চেরি, চন্দ্রমল্লিকা, জবা, সূর্যমুখী, গ্ল্যাডিওলাস, ডালিয়া, স্টার, মাম, কাঠমালতী, বেলি, জারবেরা, জিপসি—দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে অন্তত চল্লিশ প্রজাতির ফুল উৎপাদন হয়। এখানকার ফুল রাজধানীর শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে ফুলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাষিরা আগের পাঁচ মাস ধরেই বাগানে দিন-রাত পরিশ্রম করে থাকেন।
তবে চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ফুলচাষিরা জানান, গত বর্ষায় টানা বৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে ছিল। এতে অনেক জমিতে চারা রোপণই করা যায়নি, আবার যেসব জমিতে রোপণ করা হয়েছিল সেগুলোর বড় অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু ফলন কম হওয়ায় লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একাধিক চাষি জানান, জলাবদ্ধতার কারণে মাটির গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেতেই জমি প্রস্তুত করতে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। তবু প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ায় তারা হতাশ। কেউ কেউ জানিয়েছেন, এ বছর লোকসান সামাল দিতে না পারলে আগামী মৌসুমে ফুল চাষ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে চাষিদের দুর্দশার মাঝেও সাবদি ও দীঘলদির ফুলবাগানগুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ পরিবার নিয়ে এসব বাগানে আসছেন। সাশ্রয়ী মূল্যে তাজা ফুল কেনার সুযোগ থাকায় বিশেষ দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় আরও বাড়ে। এতে স্থানীয়ভাবে কিছু অতিরিক্ত আয় হলেও তা চাষিদের সামগ্রিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
ফুলচাষিরা বলছেন, কৃষি খাতে সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে সহায়তা জরুরি। চলতি বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং ভবিষ্যতে ফুল চাষ অব্যাহত রাখতে তারা স্বল্পসুদে কৃষিঋণ, আর্থিক প্রণোদনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে বন্দর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ইয়াছিন আরাফাত জানান, ফুল চাষ এই এলাকার কৃষি খাতে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। ফলন বাড়াতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আগেও জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও জানানো হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে চাষিরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
বন্দর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছর উপজেলায় প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হলেও চলতি বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫ হেক্টরে। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে যে, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ুজনিত প্রভাব ফুল চাষের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সব মিলিয়ে, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার প্রভাব নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ফুল চাষকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যথাযথ পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আর্থিক সহায়তা ছাড়া এই সম্ভাবনাময় খাত টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।