
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তার ৩৬ বছরের শাসনামলে বহুবার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমন ও আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করেছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে তার দীর্ঘ শাসনের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলার হুমকি এবং চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনা তাকে নতুন করে চাপে ফেলেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস সুপরিচিত। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। এতে বহু মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে। বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দিলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। গত বছরের জুনে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হলে খামেনিকে গোপনে আশ্রয় নিতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইরান-সমর্থিত ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়। এর জেরে ইসরায়েল ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলা জোরদার করে। লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব কিছুটা কমে যায় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছে। তেহরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে। তবে পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের মতে, এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে খামেনি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন।
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খামেনি। সরকার, সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের ওপর তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে। নির্বাচিত সরকার দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করলেও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত তার অনুমোদন ছাড়া হয় না।
শুরুর দিকে অনেকেই তাকে তুলনামূলক দুর্বল নেতা মনে করতেন। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি-এর মতো ধর্মীয় মর্যাদা তার ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিপ্লবী নিরাপত্তা কাঠামোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ক্ষমতা সুসংহত করেন।
তার ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজ। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিক্ষোভ দমন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দমন এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভ মোকাবিলায় এসব বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ‘সেতাদ’ নামে পরিচিত আধা-রাষ্ট্রীয় আর্থিক সাম্রাজ্যও তার প্রভাবের আরেকটি উৎস।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লব, ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ দ্বন্দ্ব খামেনির রাজনৈতিক অবস্থানকে কঠোর করেছে। ১৯৮১ সালের এক বোমা হামলায় আহত হয়ে তার ডান হাত পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। শাহ আমলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়।
সময়ের প্রবাহে একসময় যাকে দুর্বল নেতা মনে করা হতো, তিনি এখন ইরানের ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তবে অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত তার দীর্ঘ শাসনকে এক অনিশ্চিত মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।