বকেয়া পাওনা পরিশোধে দীর্ঘদিনের গড়িমসির কারণে ভারতীয় বাজেট এয়ারলাইন স্পাইসজেট-কে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে সংস্থাটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা জটিল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের গুয়াহাটি ও ইম্ফলের মতো গন্তব্যে চলাচলকারী বিমানগুলোকে এখন বাংলাদেশের আকাশপথ এড়িয়ে দীর্ঘতর রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম পিটিআই-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারের বিপরীতে নির্ধারিত ফি বাবদ স্পাইসজেটের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বকেয়া রয়েছে। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ একাধিকবার এই বকেয়া পরিশোধের জন্য তাগাদা দিলেও সংস্থাটি তা পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি স্থগিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আকাশসীমা ব্যবহারের ফি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার একটি নিয়মিত অংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই ফি পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্পাইসজেটের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার থেকেই স্পাইসজেটের একাধিক ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা এড়িয়ে বিকল্প ও দীর্ঘতর রুট ব্যবহার করছে। এর ফলে ফ্লাইটের সময় বেড়েছে, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অপারেশনাল পরিকল্পনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিমান চলাচল বিশ্লেষকরা।
এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে স্পাইসজেট কর্তৃপক্ষও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং এটি একটি নিয়মিত বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার অংশ। স্পাইসজেট দাবি করেছে, আকাশসীমা সংক্রান্ত এই সমস্যার প্রভাব তাদের সামগ্রিক পরিষেবায় পড়েনি এবং এখন পর্যন্ত কোনো ফ্লাইট বাতিল করা হয়নি।
স্পাইসজেট আরও জানায়, বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি তাদের ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছে। তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে দৈনিক ৩০০টির বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংস্থাটির চিফ বিজনেস অফিসার দেবজো মহর্ষি বলেন, সম্প্রতি স্পাইসজেট তাদের সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ করেছে, যা ব্যবসার প্রতি তাদের বাড়তে থাকা আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। তিনি বলেন, যাত্রীদের নির্ভরযোগ্য পরিষেবা দেওয়া এবং অপারেশনাল স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
তবে এই ঘটনার প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। খবর প্রকাশের পর ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ-এ স্পাইসজেটের শেয়ারের দামে পতন দেখা যায়। বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে সংস্থাটির শেয়ারদর প্রায় ১ শতাংশ কমে ১৬ দশমিক ৮১ রুপিতে নেমে আসে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংস্থাটির আর্থিক অবস্থা ও অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
উল্লেখ্য, স্পাইসজেট সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে সংস্থাটি প্রায় ২৬৯ দশমিক ২৭ কোটি রুপি লোকসান করেছে বলে জানা গেছে। এর ফলে বিভিন্ন দেনা-পাওনা ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে সংস্থাটির ওপর চাপ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না পারায় স্পাইসজেটের উত্তর-পূর্ব ভারত রুটে ব্যয় ও সময় উভয়ই বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এটি টিকিটের দাম ও অপারেশনাল লাভজনকতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দ্রুত বকেয়া পরিশোধ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, বকেয়া ফি ইস্যুতে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা স্পাইসজেটের জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়—কত দ্রুত সংস্থাটি বকেয়া নিষ্পত্তি করে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারে এবং স্বাভাবিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনায় ফিরতে সক্ষম হয়।
