
সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলায় যমুনা নদীর চরে গোপনে ঘোড়া জবাই করে মাংস ঢাকায় বিক্রির উদ্দেশ্যে পরিবহনের প্রস্তুতিকালে একটি চক্রকে আটক করেছে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে প্রায় ৪০০ কেজি ঘোড়ার মাংস জব্দ করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে জড়িত দুইজনকে দুই মাসের কারাদণ্ড ও দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পরে জব্দ করা মাংস মাটি চাপা দিয়ে ধ্বংস করা হয়।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকালে উপজেলার মেঘাই নদীঘাট এলাকায় যমুনা নদীর তীরে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন কাজিপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, অবৈধভাবে পশু জবাই ও মাংস বাজারজাতের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাটি নজরদারিতে ছিল।
ইউএনও মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অভিযানের সময় আটটি ঘোড়া জবাই করে ১১টি বস্তায় ভরে আনুমানিক ৪০০ কেজি মাংস পরিবহনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মাংসগুলো ঢাকায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্টরা পালানোর চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিতাইভাঙ্গা গ্রামের মৃত আরজুল্লার ছেলে কাউসার আলী পলাশ (৩৫) এবং একই এলাকার মৃত জয়নাল আবেদীনের ছেলে শরিফুল ইসলাম (৪৫)। তাদের বিরুদ্ধে ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১’-এর ৪(১) ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যেককে দুই মাসের কারাদণ্ড ও দুই হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।
আইন অনুযায়ী, অনুমোদনহীনভাবে পশু জবাই ও মাংস বাজারজাত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। প্রশাসন জানায়, জনস্বার্থে এ ধরনের অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অভিযানে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল আহাদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জবাই করা মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি ও মান নিয়ন্ত্রণ মানা বাধ্যতামূলক। এসব মানদণ্ড উপেক্ষা করলে খাদ্যজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) আবু সাইদ ও পুলিশ পরিদর্শক আলী আকবর অভিযানে সহযোগিতা করেন। তারা জানান, অবৈধ মাংস বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে।
এছাড়া কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কাজিপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম অভিযানে উপস্থিত থেকে বলেন, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত জরুরি। অবৈধ মাংস বাজারজাত হলে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ভবিষ্যতেও নজরদারি বাড়ানো হবে।
স্থানীয়দের মতে, যমুনা নদীর চরাঞ্চলগুলোতে কখনো কখনো নজরদারির ঘাটতির সুযোগে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ায় অপরাধীরা চাপে রয়েছে। তারা আশা প্রকাশ করেন, নিয়মিত অভিযান চালানো হলে অবৈধ পশু জবাই ও মাংস পাচার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
প্রশাসন জানায়, অভিযানে জব্দ করা মাংস পরিবেশসম্মতভাবে মাটি চাপা দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে কোনোভাবেই তা বাজারে পৌঁছাতে না পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, কাজিপুরে ৪০০ কেজি ঘোড়ার মাংস জব্দ ও দুইজনের কারাদণ্ডের এই ঘটনা অবৈধ মাংস বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।