
মিসরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পোর্ট সাইদ প্রদেশে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের সবাই স্থানীয় জেলে বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একটি পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী পিকআপের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। একই দুর্ঘটনায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুর্ঘটনাটি ঘটে মিসরের পোর্ট সাইদ প্রদেশ এলাকায়। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, যাত্রীবাহী পিকআপটিতে থাকা জেলেরা কাজের উদ্দেশ্যে মাছের খামারে যাচ্ছিলেন। প্রতিদিনের মতোই তারা দলবদ্ধভাবে ভ্যানে করে কর্মস্থলের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে দ্রুতগতির পণ্যবাহী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে পিকআপটি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার সময় পিকআপটি দুইটি বড় ট্রাকের মাঝখানে পড়ে যায়। এতে করে যানটি প্রচণ্ড চাপে পিষ্ট হয়ে দুমড়েমুচড়ে যায় এবং রাস্তার ধারে ছিটকে পড়ে। সংঘর্ষের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই বহু যাত্রীর মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে এলেও পিকআপটির অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে অনেককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জরুরি সেবা সংস্থার কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠান এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আহত তিনজনের অবস্থা গুরুতর এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় নিহতদের অধিকাংশই পোর্ট সাইদ এলাকার দরিদ্র জেলে পরিবারগুলোর উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন। প্রতিদিন মাছের খামারে কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় পরিবারগুলো গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহতদের অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন।
দুর্ঘটনার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোস্তাফা মাদবৌলি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। একই সঙ্গে নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
মিসরের সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতি এবং রাস্তার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এই দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
মিসরে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। দেশটিতে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষদের বহনকারী ছোট যানবাহনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় প্রাণহানির ঝুঁকি বেশি থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এই ঘটনায় আবারও সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী ও শ্রম সংগঠনের প্রতিনিধিরা দাবি জানিয়েছেন, শ্রমিক ও জেলেদের পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বলছেন, পিকআপ বা খোলা যানবাহনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ করা এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা চালু না হলে এমন দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
এদিকে নিহতদের দাফন ও আহতদের চিকিৎসা ঘিরে পোর্ট সাইদ এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পোর্ট সাইদে ট্রাক ও পিকআপের সংঘর্ষে ১৮ জেলের মৃত্যুর ঘটনা মিসরে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণঘাতী ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।