
সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তাবাসসুম (৬) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মাছবোঝাই শ্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি নসিমনের ধাক্কায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। একই দুর্ঘটনায় আরও এক শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকালে সলঙ্গা–তাড়াশ আঞ্চলিক সড়কের রৌহাদহ এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নিহত তাবাসসুম সলঙ্গা উপজেলার চৈত্রহাটি গ্রামের বাসিন্দা তফিস উদ্দিনের মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি প্রতিদিনের মতো বাড়ির আশপাশেই ছিল। কিন্তু এক মুহূর্তের অসতর্কতায় তার জীবন এভাবে ঝরে যাবে—তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনার সময় রৌহাদহ বাজারের পূর্ব পাশে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম বাজানো হচ্ছিল, যা আশপাশের পরিবেশকে বেশ সরব করে তোলে। সেই শব্দের মধ্যেই দুই শিশু হঠাৎ দৌড়ে সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করে। ঠিক তখনই তাড়াশের দিক থেকে আসা মাছবোঝাই একটি নসিমন পেছন দিক থেকে তাদের ধাক্কা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নসিমনটির গতি তুলনামূলক বেশি ছিল। শিশু দুটি সড়কে ওঠার পরপরই গাড়িটির নিচে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তাবাসসুম গুরুতর আহত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। পাশে থাকা আরেক শিশু মারাত্মকভাবে আহত হলে স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন।
আহত শিশুটিকে প্রথমে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বগুড়ায় স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, আহত শিশুটির অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক এবং সে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। অল্প বয়সে একটি শিশুর এমন করুণ মৃত্যুতে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর বেদনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, গ্রামীণ সড়কে নসিমনসহ শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করছে, যা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সলঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহমুদ কবির জানান, দুর্ঘটনার পর নসিমনটি সড়কের পাশে একটি ক্ষেতে ফেলে রেখে চালক পালিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় স্থানীয় লোকজন গাড়িতে থাকা মাছ নিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং নিহত শিশুর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত নসিমনচালককে শনাক্ত ও আটক করার জন্য চেষ্টা চলছে। দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
এই দুর্ঘটনা আবারও গ্রামীণ সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নসিমনের মতো অবৈধ বা অর্ধ-নিয়ন্ত্রিত যানবাহন গ্রামীণ সড়কে চলাচলের ফলে ঝুঁকি বাড়ছে। এসব যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং আইন প্রয়োগ জোরদার না হলে এমন দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিয়ের অনুষ্ঠান বা হাটবাজারের সময় সড়কের পাশে অতিরিক্ত ভিড় ও উচ্চ শব্দের কারণে শিশুদের নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনেরও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
তাবাসসুমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্যই গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি অসচেতন মুহূর্ত এবং নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের কারণেই একটি শিশুর জীবন ঝরে গেল—এই বাস্তবতা নতুন করে গ্রামীণ সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।