
গতকাল বাংলাদেশে ১৪৪৭ হিজরি সালের পবিত্র মাহে রমজান চাঁদ দেখা যাওয়ায় আজ বৃহস্পতিবার থেকে মাসব্যাপী রমজান পালন শুরু হয়েছে। আহলান সাহলান মাহে রমজান। এই পবিত্র মাসে আল্লাহর রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের বার্তা আমাদের নিকট আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে।
রমজান কেবল খাদ্য বা পানির সংযম নয়; এটি নৈতিক পরিশুদ্ধি ও চরিত্রগঠনের এক মহাসময়। সিয়াম বা উপবাসের মাধ্যমে মানুষ দেহের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন করতে পারে। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, মানুষ শুধুমাত্র দেহেরই নয়, তার আত্মারও দায়িত্ববান। মাহে রমজান এই দায়িত্ববোধ জাগিয়ে দেয়।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম সিয়ামের মূল লক্ষ্য হ’ল তাকওয়া—অর্থাৎ অন্তরের গভীরে আল্লাহভীতি ও নৈতিক সচেতনতার বিকাশ। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সংযম পালন করার সময় মানুষ দুঃখী, দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। এতে সহমর্মিতা, দান ও সামাজিক ন্যায়বোধ জন্মায়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
"হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" (সুরা আল-বাকারা : ১৮৩)
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা বা মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার জন্য পানাহার বর্জন আল্লাহর কাছে কোনো প্রয়োজনীয়তা রাখে না।” (সহিহ আল-বুখারি) অর্থাৎ, সিয়ামের প্রকৃত তাৎপর্য বাহ্যিক উপবাস নয়; এটি চরিত্রসংযম ও নৈতিক আচরণের মধ্যে নিহিত।
রমজান মানুষকে সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে মানুষ দরিদ্রের বেদনা উপলব্ধি করতে পারে। ফলে জাকাত, ফিতরা ও দান-সদকার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব হয়। উপরন্তু, কোরআনে বলা হয়েছে,
"রমজান মাস—যেই মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, তা মানবজাতির জন্য হিদায়াতস্বরূপ।" (সুরা আল-বাকারা : ১৮৫)
এই মাস কেবল সিয়ামের নয়, এটি কুরআন অনুধাবন ও আমলের মহাসাধনার সময়ও বটে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় আমরা রমজানের চেতনা ভুলে যাই। সংযমের পরিবর্তে ভোগবিলাস, ন্যায্যমূল্যের পরিবর্তে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ইবাদতের পরিবর্তে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। এটি রমজানের মূল শিক্ষা ক্ষুণ্ন করে। তাই ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান, তারা রমজানের পবিত্রতা সম্মান করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করুক। ভোক্তাদেরও সচেতন থাকা প্রয়োজন; অপ্রয়োজনীয় ক্রয় ও অপচয় এড়িয়ে সংযমের আদর্শ বজায় রাখা আবশ্যক।
আত্মসংযমের মাধ্যমে প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক দৃঢ়তা অর্জনই সিয়ামের পূর্ণতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে রমজানের শিক্ষা প্রতিফলিত হলে দুর্নীতি, অবিচার ও বৈষম্য অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
অতএব, মাহে রমজানের শিক্ষা আমাদের আত্মসংস্কার, সামাজিক ন্যায় ও মানবিক জাগরণের মহাঅভিযানে নিয়োজিত করুক। সত্যভাষণ, ন্যায়পরায়ণতা, পরনিন্দা ও হিংসাবিদ্বেষ পরিহার ছাড়া রোজা বা সিয়ামের পূর্ণতা অর্জন সম্ভব নয়। তাকওয়া, ত্যাগ ও সত্যনিষ্ঠার আলোয় উজ্জ্বল হোক ব্যক্তি ও সমাজজীবন—এই হোক পবিত্র রমজানের প্রত্যাশিত অর্জন। সকল মুসলিম ভাইবোনকে জানাই মাহে রমজানের মোবারকবাদ।