
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি-র একটি নির্দিষ্ট অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা এবং চলমান সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, অর্থাৎ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), বর্তমানে ওই অঞ্চলে সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে। মহড়ার অংশ হিসেবেই প্রণালির একটি নির্দিষ্ট এলাকা কয়েক ঘণ্টার জন্য নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে সীমিত করা হয়। ইরান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্তের লক্ষ্য জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মহড়ার কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা।
ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছে। ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে, যা সমুদ্রপথে পরিবাহিত বৈশ্বিক তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এবারের পদক্ষেপটি পুরো প্রণালি বন্ধ নয়; বরং সাময়িক ও আংশিক। তাই বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আপাতত নেই। কিছু জাহাজের চলাচলে বিলম্ব হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এই পদক্ষেপের সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ। একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা-তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা চলছে। আলোচনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, দুই দেশ কিছু নির্দেশনামূলক নীতিতে একমত হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তির সম্ভাবনা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনার সময় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের এমন পদক্ষেপ নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হুমকি দেওয়ার পরও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। অতীতেও বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ইরান এ জলপথে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে।
তেলবাজারের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি বা আতঙ্ক লক্ষ্য করা যায়নি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু এটি একটি সীমিত ও সময়সাপেক্ষ পদক্ষেপ, তাই বিনিয়োগকারীরা আপাতত পরিস্থিতিকে নজরে রাখছেন, তবে আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়া দেখাননি।
হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক রাজনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার আলোচনায় কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। বিশ্বের বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এখানে যেকোনো উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান বলছে, তাদের পদক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে প্রতিরক্ষামূলক এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া। তবে আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতির অগ্রগতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জেনেভার আলোচনার ফলাফল এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার মাত্রা কতটা বাড়বে বা কমবে।