
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে, তার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোহিঙ্গা সংকট। এটি আর শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জটিল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেয় দেশটির সামরিক বাহিনী, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে Tatmadaw নামে পরিচিত। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেয় এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রশংসা পায়। কিন্তু প্রায় এক দশক পার হলেও প্রত্যাবাসন কার্যত শুরু হয়নি। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে।
এই দীর্ঘসূত্রতা স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে। পাহাড় কাটার ফলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, শ্রমবাজারে চাপ, মাদক ও মানবপাচার চক্রের সক্রিয়তা এবং শিবিরকেন্দ্রিক সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হোস্ট কমিউনিটির মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা তুলনামূলক বেশি থাকলেও বর্তমানে তহবিল সংকট স্পষ্ট। United Nations High Commissioner for Refugees (ইউএনএইচসিআর) এবং অন্যান্য সংস্থা খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহায়তা দিলেও বৈশ্বিক নানা সংকটের কারণে অর্থায়ন কমেছে। ফলে খাদ্য সহায়তা হ্রাস ও হতাশা বৃদ্ধি নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে।
বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট—স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত সেই পরিবেশ তৈরি হতে দেয়নি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও তালিকা বিনিময় সত্ত্বেও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।
এক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। Association of Southeast Asian Nations (আসিয়ান) আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। একইভাবে Organisation of Islamic Cooperation (ওআইসি) আন্তর্জাতিক সমর্থন ও আইনি প্রক্রিয়ায় একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক চাপ ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নে চীন ও ভারতের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশের সঙ্গে মিয়ানমারের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাঠামো নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সীমান্ত স্থিতিশীলতার অভিন্ন স্বার্থকে ভিত্তি করে সমন্বিত অবস্থান গড়ে তোলা বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে।
আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও শক্ত নীতি প্রয়োজন। শিবিরে আইনশৃঙ্খলা জোরদার, হোস্ট কমিউনিটির উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
নতুন সরকার একটি নতুন ম্যান্ডেট পেয়েছে। এই ম্যান্ডেট কেবল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের নয়; আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় ও কৌশলগত নেতৃত্ব প্রদর্শনেরও সুযোগ। রোহিঙ্গা সংকট সমাধান তাই শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি নতুন সরকারের নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরীক্ষা।