
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সময়ে নানা দিবস উদযাপন হয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি হলো ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা ভালোবাসা দিবস, যা প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। তবে ইসলামে এ দিবসের কোনো স্বীকৃত ধর্মীয় ভিত্তি নেই বলে অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম মত প্রকাশ করেছেন।
ভ্যালেন্টাইনস ডে-এর উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রোমান ধর্মযাজক Saint Valentine খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতেন। সে সময় রোম সম্রাট Claudius II তাকে দেব-দেবীর পূজা করতে বললে তিনি তা অস্বীকার করেন। এর ফলে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়।
জনশ্রুতি আছে, কারাগারে থাকা অবস্থায় যুবক-যুবতীরা তাকে দেখতে যেত এবং ফুল উপহার দিত। পরে ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তার স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪)।
বর্তমানে অনেক তরুণ-তরুণী এ দিনে ভালোবাসা প্রকাশের নামে সাক্ষাৎ, উপহার বিনিময়, কনসার্ট, আড্ডা ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কেউ কেউ সমালোচনা করে থাকেন যে, এর আড়ালে অবাধ মেলামেশা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডও ঘটে থাকে।
ভালোবাসা দিবস নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
১. বিজাতীয় সংস্কৃতি অনুসরণ
হাদিসে এসেছে: ‘যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১)। অনেক আলেমের মতে, ভ্যালেন্টাইনস ডে খ্রিস্টান ঐতিহ্যভিত্তিক হওয়ায় মুসলমানদের তা অনুসরণ করা উচিত নয়।
২. অবৈধ সম্পর্ক ও ব্যভিচার প্রসঙ্গ
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না; নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ’ (সুরা আল-ইসরা: ৩২)। কেউ কেউ মনে করেন, ১৪ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে অনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়।
৩. ফিতনার আশঙ্কা
কিছু ইসলামি বিশ্লেষকের মতে, এ দিনকে কেন্দ্র করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেহায়াপনা ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৪. অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়
কোরআনে এসেছে: ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই’ (সুরা আল-ইসরা: ২৭)। ফুল, কার্ড ও উপহারে অতিরিক্ত ব্যয়কে অনেক আলেম নিরুৎসাহিত করেন।
৫. ইসলামি সংস্কৃতির প্রভাব
কিছু ধর্মীয় বিশ্লেষকের মতে, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব মুসলিম সমাজের নিজস্ব মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইসলামে ভালোবাসার বিকল্প চর্চা
ইসলামে ভালোবাসা একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ, তবে তা শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে।
১. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন প্রয়োজন নেই; যেকোনো সময় উপহার ও সৌহার্দ্য প্রদর্শন করা যায়।
২. মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন ও অভাবীদের প্রতি ভালোবাসা ও দয়া প্রদর্শন ইসলামি শিক্ষার অংশ।
৩. আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
৪. অবৈধ সম্পর্কের পরিবর্তে ইসলামের বিধান অনুযায়ী বিবাহের মাধ্যমে পবিত্র সম্পর্ক স্থাপনকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
ভালোবাসা দিবস নিয়ে মুসলিম সমাজে মতভেদ রয়েছে। কেউ এটিকে কেবল সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে দেখেন, আবার কেউ শরিয়তসম্মত নয় বলে মনে করেন। তবে ইসলামি শিক্ষায় ভালোবাসা, দয়া ও সৌহার্দ্যের গুরুত্ব সর্বদা বিদ্যমান—যা নির্দিষ্ট কোনো দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।