
বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসের শাসনামলের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই সরকারের বিদায় নেওয়ার কথা থাকায় তাদের সামগ্রিক কার্যক্রম নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি—সংবিধানসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’ এবং একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন। এসব ক্ষেত্রেই সরকার নিজেদের সফল বা অন্তত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের দাবি করছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, তিনটি এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কিছু সাফল্য এলেও সংস্কার প্রক্রিয়া সরকারের ভেতরের একটি অংশের কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারের ক্ষেত্রে ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’—এই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার রাষ্ট্র সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ১১টি কমিশন গঠন করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। এর ফলে অন্তত ৩০টি বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে চারটি প্রশ্নে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংস্কার কমিশন ও জুলাই চার্টারের কৃতিত্ব সরকার নিতে পারে, তবে এটি পিক অ্যান্ড চুজ ও এডহক সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কার কমিশনই গঠন হয়নি, আবার যেগুলো হয়েছে সেগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার কাঙ্ক্ষিত দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি।
অন্যদিকে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দাবি করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে এত সংস্কার আগে কখনও হয়নি। তবে গণভোটে ‘না’ ভোট জয়ী হলে এসব সংস্কার উদ্যোগ টিকে থাকবে কি না—তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে সরকার বড় অর্জন হিসেবে দেখছে। ইতোমধ্যে একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডসহ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় দেওয়া হয়েছে।
তবে ঢালাও হত্যা মামলা, শিক্ষক-সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে আসামি করা এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এসব কারণে প্রকৃত বিচার না হয়ে প্রতিশোধমূলক বিচারের অভিযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকার চাইলে এড়াতে পারতো।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠেছে মব সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা, মাজার ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় ভাঙচুর, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা দেশ-বিদেশে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৪ মাসে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এসেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও নতুন করে উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলক ভালো করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের অর্জন। তবে সামাজিক ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নারীর সমতার ক্ষেত্রেও এই সরকারের সময়ে বড় ধাক্কা এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নারীদের ওপর হামলা, নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে সহিংসতা এবং এসব ঘটনায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা সমালোচিত হয়েছে।
সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি, নির্বাচন আয়োজন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক খাতে স্থিতিশীলতা আনার উদ্যোগ তাদের বড় সাফল্য। পাশাপাশি গুম-খুন বন্ধ হওয়া ও পুলিশ বাহিনী সংস্কারের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।