
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন চার দেশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। প্রস্তাবিত এই ফোরামে বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমার ও পাকিস্তানকে একত্র করার কথা বলা হয়েছে। তবে নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে এমন প্রস্তাব আসায় এটিকে কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এই মুহূর্তে চার দেশীয় জোট নিয়ে কোনো ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে কোনো আলোচনাও হয়নি। নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া সরকার চাইলে এটি বিবেচনা করতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানও জানে যে নির্বাচন সামনে রেখে এমন জোট বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। তবুও এই প্রস্তাবের মাধ্যমে মূলত ভারতকেই একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে ইসলামাবাদ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চলমান অস্বস্তি আরও গভীর হতে পারে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, গত ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে ফোন করেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার। এ সময় তিনি চার দেশকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক বৈঠকের প্রস্তাব দেন এবং নির্বাচনের আগেই বৈঠক আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান।
চার দেশীয় ফোরামের ধারণাটি পুরোপুরি নতুন নয়। গত বছরের জুন থেকে চীন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। চীনের কুনমিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও বাংলাদেশ সম্মতি না দেওয়ায় উদ্যোগটি এগোয়নি। তখন ঢাকার অবস্থান ছিল—শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো দেশ যুক্ত না হলে এমন জোট কার্যকর হবে না। এবার সেই জায়গায় মিয়ানমারকে যুক্ত করে নতুন প্রস্তাব সামনে এনেছে পাকিস্তান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ সবসময় বৈরিতা এড়িয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী। যে কোনো আঞ্চলিক জোট যদি উত্তেজনা বাড়ায়, বাংলাদেশ তাতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নতির দিকে যায়। সামরিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের আলোচনা শুরু হয়। জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য আলোচনা এবং এখন চার দেশীয় ফোরামের প্রস্তাব—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভারতের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।
এ ছাড়া সার্ক দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকায় পাকিস্তান ভারতকে বাদ দিয়ে নতুন আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম গড়তে চায়, যেখানে চীনের উপস্থিতি থাকবে। চীনের লক্ষ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে চীনের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও এই কৌশলের অংশ।
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকটসহ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা জটিলতা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় মিয়ানমারকে নিয়ে কোনো জোট বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনপূর্ব সময়ে এই প্রস্তাব মূলত ভারতের উদ্দেশে একটি কূটনৈতিক সংকেত। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনই কোনো অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনা নেই। নির্বাচিত সরকার এলে বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচিত হতে পারে।