
ওমানের রাজধানী মাসকাটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যে ‘সর্বোচ্চ চাপের’ কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, তা আলোচনাকে সফল হওয়ার বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া বিশ্লেষণে তারা বলেন, আলোচনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল এখনো স্পষ্ট নয়। বরং পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে একাধিক কঠোর শর্ত যুক্ত করায় আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার শুরু হওয়া এই বৈঠকটি গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর প্রথম সরাসরি আলোচনা। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অংশ নিচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার। ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের এটি আরেকটি সংবেদনশীল অধ্যায়। মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তির আগ্রহ দেখালেও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং পরবর্তী মার্কিন হামলার পর সেই আলোচনা ভেঙে পড়ে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ট্রাম্প প্রশাসন আরও সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেয় এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে। একই সঙ্গে ইরানের উপকূলে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আগের অনুসৃত চাপ প্রয়োগের কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের পরিচালক সিনা আজোদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে ইরান বর্তমানে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। সে কারণেই তারা এখন সর্বোচ্চ দাবি তোলার উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখছে এবং আলোচনার মাধ্যমে যত বেশি সম্ভব ছাড় আদায় করতে চায়।
এই দাবির তালিকায় শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা নয়, বরং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্র যাদের ‘প্রক্সি’ বলে চিহ্নিত করে—সেসব আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধের বিষয়ও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিস্তৃত এজেন্ডাই আগেও আলোচনাকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আলোচনা অর্থবহ হতে হলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনগুলোকে সহায়তা এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি আলোচনায় থাকতে হবে।
একই দিনে এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হুমকি দিয়ে বলেন, তার ‘খুব চিন্তিত থাকা উচিত’। তবে পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের কাছ থেকে মূলত দুটি বিষয় চান—পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করা।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, আলোচনা চললেও ইরানি নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে, কূটনীতির বাইরে প্রেসিডেন্টের হাতে আরও বিকল্প রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য আদৌ শুধু পারমাণবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা পরিষ্কার নয়। তার মতে, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়াই আলোচনায় যায় এবং ইরান কী দিতে রাজি হয়, তার ওপর ভিত্তি করে লক্ষ্য পরিবর্তন করে।
ভায়েজ সতর্ক করে বলেন, নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়বে।
অন্যদিকে সিনা আজোদি বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখা হলে ইরান বড় কোনো ছাড় দেবে না। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্বল করা হলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার মুখে ইরান কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়বে, যা দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি।