
বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে জাতীয় সংসদ বর্তমানে বহাল না থাকায় নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ করানো নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের কাছে এমপিরা শপথ নিলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার না থাকলে ডেপুটি স্পিকার শপথ পড়াবেন। তবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কেউই দায়িত্ব পালনের অবস্থায় না থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ পড়াতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনয়ন দেবেন। উদাহরণ হিসেবে প্রধান বিচারপতির নামও উল্লেখ করেন তিনি।
আইন উপদেষ্টা আরও জানান, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নির্বাচিত হওয়ার তিন দিন পার হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও এমপিদের শপথ পড়াতে পারেন। তবে সরকার নির্বাচনের পর দ্রুত শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করতে চায় বলে তিন দিন অপেক্ষা না করে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ করানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তিনি বলেন, এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় এবং এ নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর চূড়ান্ত মতামত প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ কার্যত শূন্য থাকায় সংবিধানের বিশেষ ধারা অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পড়াবেন। তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থায় সংবিধানের ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য, যেখানে বলা হয়েছে গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তার মনোনীত কেউ শপথ পড়াতে না পারলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে পারবেন। পাশাপাশি সংবিধানের তপশিল-৩ অনুযায়ীও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়েই দায়িত্বে না থাকলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়ানোর ক্ষমতা রাখেন।
প্রসঙ্গত, গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। তার আগে আগস্ট মাসে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। ফলে শপথগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন সংসদ ও সরকার গঠন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হবে। তিনি জানান, এমপিরা শপথ নেওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। এরপর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন সরকারে কোনো ভূমিকা থাকবে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুরো প্রক্রিয়াটি তিন দিনের মধ্যেই শেষ হতে পারে এবং ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হতে পারে। তবে সর্বোচ্চ সময় লাগলেও ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির বেশি সময় লাগবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল আলম আরও বলেন, দেশে বর্তমানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ রয়েছে এবং অতীতে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি জানান, রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংস্কারের লক্ষ্যে ‘জুলাই চার্টার’ তৈরি করা হয়েছে এবং এটি এখন গণভোটের আওতায় এসেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ এর বিষয়ে তাদের মতামত জানাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন।
নির্বাচনকে ঘিরে শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার চূড়ান্তভাবে কোন পদ্ধতিতে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণ করাবে।