
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজশাহী বিভাগে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়লেও এর আড়ালে তৈরি হয়েছে নীরব নিরাপত্তা উদ্বেগ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পার হলেও এই বিভাগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্র নির্বাচনের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. বজলুর রশীদ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের জানান, বিভাগে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তিনি বলেন, কিছু বিচ্ছিন্ন সমস্যা থাকলেও সেগুলো সমাধানযোগ্য।
তবে একই ব্রিফিংয়ে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়াটা বড় উদ্বেগের বিষয়। তিনি জানান, এসব অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহৃত হতে পারে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই দিনের ঘটনায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে মোট ৩৪৯টি আগ্নেয়াস্ত্র লুণ্ঠিত হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে ২৫৭টি। অর্থাৎ ৯২টি অস্ত্র এখনো নিখোঁজ। গোলাবারুদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। লুট হওয়া ১৬ হাজার ৮২২ রাউন্ড গুলির মধ্যে উদ্ধার হয়েছে মাত্র পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। বাকি প্রায় ১১ হাজার রাউন্ড এখনো বাইরে রয়ে গেছে।
গত ২১ জানুয়ারি রাজশাহী নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানা থেকে লুট হওয়া শটগানের ১৩ রাউন্ড গুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে সামগ্রিক হিসাবে উদ্ধার অগ্রগতি আশানুরূপ নয়।
এ ছাড়া লাইসেন্সকৃত অস্ত্র জমার ক্ষেত্রেও অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগে লাইসেন্সকৃত অস্ত্রের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ২৭৯টি। এর মধ্যে জমা পড়েছে আনুমানিক এক হাজার ১৩১টি। বাকিগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। সব মিলিয়ে দেড় বছরে রাজশাহী বিভাগে প্রায় সাড়ে বারো শত অস্ত্র ও ১১ হাজারের বেশি গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হক মনে করেন, বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও বটে। তার মতে, বেসামরিক মানুষের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকা মানেই পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সামনে জাতীয় নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
সমাজকর্মী নাসরিন বেগম বলেন, বিপুল অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে থাকলে সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এতে ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেনের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্ত্র সবসময় এক ধরনের নীরব শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, অবাধ নির্বাচনের জন্য শুধু ব্যালট নয়, ভোটারদের মানসিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হবে—শক্তিশালীরাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে ভোটের প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা যৌথবাহিনীর অভিযান আরও জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রাজশাহী বিভাগে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে প্রশাসনের আশ্বাস থাকলেও নিখোঁজ অস্ত্র ও গোলাবারুদের হিসাব গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেড় বছরে উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্র কেবল সংখ্যার বিষয় নয়—এগুলো সম্ভাব্য সহিংসতারও ইঙ্গিত বহন করে। অস্ত্র উদ্ধার ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ ছাড়া নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।