
কারাগারের লোহার ফটকের সামনে থেমে থাকা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স, ভেতরে স্তব্ধ দুটি মরদেহ—আর কয়েক মিনিটের জন্য চোখের সামনে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম এভাবেই শেষবারের মতো স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মুখ দেখলেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে।
শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি যশোর কারাগারের প্রধান ফটকে পৌঁছায়। কারা কর্তৃপক্ষ মানবিক বিবেচনায় সাদ্দামের পরিবারের ছয় সদস্যসহ অ্যাম্বুলেন্সটিকে কারাফটকের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। পরে কারাবন্দি সাদ্দামকে প্রায় পাঁচ মিনিটের জন্য স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, সাধারণত কোনো কারাবন্দির স্বজনের মৃত্যু হলে বিশেষ অনুমতি ছাড়া এমন সুযোগ দেওয়া হয় না। তবে মরদেহ কারাগারের ফটকে আনা হলে মানবিক দিক বিবেচনায় সীমিত সময়ের জন্য দেখার সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই ঘরে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায় তাদের ৯ মাস বয়সী শিশু নাজিমকে। পুলিশ ও পরিবারের প্রাথমিক ধারণা, মানসিক হতাশা থেকে সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন সুবর্ণা।
পুলিশ জানায়, স্বর্ণালীকে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং শিশুটিকে নিথর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
সাদ্দাম বর্তমানে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। আওয়ামী সরকার পতনের পর গত ৫ আগস্ট তাকে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পর সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির জন্য বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে কোনো লিখিত আবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, যেহেতু সাদ্দাম যশোর কারাগারে আটক রয়েছেন, প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি যশোর জেলা প্রশাসনের এখতিয়ার। আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাগেরহাট প্রশাসনের কিছু করার ছিল না।
সাদ্দামের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক মামলায় আটক থাকা সত্ত্বেও মানবিক কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। কারাফটকে স্বজনদের প্রবেশ নিয়েও সীমাবদ্ধতা ছিল।
এদিকে শনিবার রাত ১১টার পর জানাজা শেষে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তার শিশুপুত্র নাজিমকে পাশাপাশি দাফন করা হয়।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনা রাজনৈতিক বন্দিদের মানবিক অধিকার ও কারাবন্দিদের পারিবারিক ট্র্যাজেডি মোকাবিলার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।