
বেসরকারি পাঁচ ব্যাংকের পর এবার সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক একীভূত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরকারকে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক রেখে বাকি ব্যাংকগুলো একীভূত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬১টি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা দেশের অর্থনীতির আকার ও চাহিদার তুলনায় অস্বাভাবিক। তার মতে, একটি কার্যকর ও সুশাসনভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো গেলে তদারকি ও সুশাসন নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরে গভর্নর বলেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, ব্যাপক অনিয়ম, পরিবারকেন্দ্রিক আধিপত্য এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তিনি জানান, ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পরিবারকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন গভর্নর। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ব্যাংকিং খাতে ব্যক্তিগত বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি সম্পর্কে গভর্নর জানান, চলতি বছরের মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ কার্যকর না হলে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
গভর্নর আরও জানান, ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ‘ব্যাংক রেজল্যুশন ফান্ড’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এ ব্যবস্থার আওতায় শুধু ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ক্যাশলেস সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রাজস্ব ফাঁকির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো নগদ লেনদেন। ক্যাশবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে। এজন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, বর্তমান গভর্নর প্রায় ধসে পড়া ব্যাংকিং খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরীফ মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ সক্ষমতা কমে গেছে, যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অর্থনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন।