
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আয়োজিত এই গণভোট ঘিরে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে। মূল বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে— অন্তর্র্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের সক্রিয় প্রচার।
সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা ও প্রতিনিধিরা জেলায় জেলায় সফর করে গণভোটে হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি সরকারি ও আধাসরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে— একটি নিরপেক্ষ অন্তর্র্বর্তী সরকার কি গণভোটে নির্দিষ্ট ফলাফলের পক্ষে প্রচার চালাতে পারে?
সমালোচকদের মতে,অন্তরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে গঠিত হয়েছে এবং তাদের প্রধান দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। সে কারণে গণভোটে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানের পক্ষে সরকারি প্রচার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের শামিল হতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকার একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এসেছে এবং সংস্কার বাস্তবায়নই তাদের মূল এজেন্ডা। তাঁর মতে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে হ্যাঁ ভোট প্রয়োজন, তাই এ বিষয়ে জনগণকে বোঝানো সরকারের দায়িত্ব।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, সরকারের হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর কোনো আইনি বা নৈতিক সুযোগ নেই। তাঁর মতে, নির্বাচন ও গণভোটে নিরপেক্ষতা রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, যা লঙ্ঘিত হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকারের মূল দর্শন হচ্ছে অরাজনৈতিক থাকা, আর গণভোট মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, সরকার গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে, তবে হ্যাঁ বা না— কোনো পক্ষেই অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই।
এই বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন ও গণভোটের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরা ইসির নিয়ন্ত্রণে থাকেন এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে আইনত বাধ্য। অথচ সরকারি নির্দেশনায় কর্মকর্তাদের হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে সচেতনতামূলক প্রচারে যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে, যা আইনজ্ঞদের মতে গুরুতর আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, জনগণের অর্থ ব্যবহার করে সরকারের কোনো পক্ষের পক্ষে প্রচার চালানো সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক। তাঁর মতে, যারা ভোট পরিচালনা করবেন, তাদের দিয়েই নির্দিষ্ট ফলের পক্ষে প্রচার চালানো নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে।
জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ১১টি মৌলিক প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে মেয়াদ সীমা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অন্যতম। যদিও বিএনপি কিছু প্রস্তাবে ভিন্নমত দিয়েছে এবং কয়েকটি দল সনদে স্বাক্ষর করেনি।
চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে হ্যাঁ বা না ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোনো প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিক দ্বিমত থাকলে ভোটার কীভাবে মত প্রকাশ করবেন— তা স্পষ্ট নয়।
এসব বিতর্ক ও প্রশ্নের মধ্যেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোটের দিকে। এখন দেখার বিষয়, এই গণভোটে আদৌ জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটে কি না।