
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি উদ্যোগের অংশ হিসেবে গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি ফিলিস্তিনি কমিটি তাদের বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। পরিকল্পনায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মৌলিক সেবা পুনরায় চালু, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
‘ন্যাশনাল কমিটি ফর গাজা ম্যানেজমেন্ট’ (এনজিএসি) নামে পরিচিত এই সংস্থার জেনারেল কমিশনার আলী শাথ জানান, বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খাত পুনরুদ্ধারই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে গাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাই মৌলিক সেবাগুলো পুনর্গঠন ছাড়া মানবিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
এক বিবৃতিতে আলী শাথ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর দিকনির্দেশনা এবং গাজাবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধির সহায়তায় এই পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তার মতে, উদ্যোগটি শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং গাজার সামাজিক সংহতি ও নৈতিক পুনর্জাগরণ নিশ্চিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ঘোষিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার আওতায় এনজিএসি গঠন করা হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে এই কাঠামো অনুমোদন পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কমিটিটি গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, পুনর্গঠন তদারকি এবং ভবিষ্যতে একটি স্বনির্ভর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে সামগ্রিক পুনর্গঠন কার্যক্রম তদারকি করবে ‘বোর্ড অব পিস’, আর মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’। তবে এসব কাঠামোয় ইসরায়েলপন্থী সদস্যদের সম্ভাব্য প্রভাব এবং ফিলিস্তিনিদের সীমিত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি হামলায় গাজা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে উপত্যকার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় এনজিএসি কতটা স্বাধীনভাবে প্রশাসনিক ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে ইসরায়েল কঠোর বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি ত্রাণ প্রবেশে বাধা দ্রুত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
এর মধ্যেই সাম্প্রতিক হামলায় আরও কয়েক শ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৫৪৮ জনে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গাজা ব্যবস্থাপনায় জাতিসংঘসহ প্রচলিত আন্তর্জাতিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে একটি নতুন প্রশাসনিক মডেল দাঁড় করাতে চাইছে। তবে অনেক ফিলিস্তিনির আশঙ্কা, এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে আড়াল করে মূলত অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।