
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে সুন্দরবনে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ জলদস্যু বাহিনীগুলো। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনকেন্দ্রিক অন্তত সাতটি দস্যুদল সক্রিয় রয়েছে, যারা জেলে ও বনজীবীদের অপহরণ, পর্যটকদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং নদীপথে চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িত।
সূত্রগুলো জানায়, শুরুতে সুন্দরবন এলাকায় মোট ১২টি দস্যু বাহিনী সক্রিয় ছিল। তবে কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে এর মধ্যে পাঁচটি বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সক্রিয় সাতটি বাহিনীর দৌরাত্ম্যে আবারও সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কোস্ট গার্ডের অভিযানে দস্যুদের কাছে জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৪৯ জন দস্যুকে আটক করা হয়। অভিযানে ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জাম, ৪৪৮ রাউন্ড কার্তুজ ও দুটি হাতবোমা উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ড জানায়, তাদের সাঁড়াশি অভিযানে নিষ্ক্রিয় হওয়া পাঁচটি বাহিনীর মধ্যে রয়েছে আছাবুর বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আনারুল বাহিনী, মঞ্জু বাহিনী ও রাঙ্গা বাহিনী। এক বছরে এসব বাহিনীর ২২ সদস্যকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের হাতে জিম্মি থাকা ৯ জন জেলেকে উদ্ধার করা হয়।
বর্তমানে সক্রিয় সাতটি বাহিনীর মধ্যে করিম শরীফ বাহিনী জিওধারা, তাম্বুলবুনিয়া, শেলা নদী, চড়পুটিয়া, ধানসিদ্ধির চর, শরণখোলা ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই বাহিনীর কাছ থেকে গত বছর ৪২ জন জিম্মিকে উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড।
ছোট সুমন বাহিনী হারবারিয়া, ধানসিদ্ধির চর, জয়মনি, মরাপশুর, জোংড়া খাল ও চড়পুঁটিয়া এলাকায় সক্রিয়। ছোটন বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে রায় নদী, খাশিটানা খাল, সোনামুখী খাল ও কলমিলতা খাল এলাকা।
কাজল মুন্না বাহিনী খোবড়াখালি, মাউন্দে নদী, কাচিখাটা নদী, নুচখালী খাল, বৈকারি নদী সংলগ্ন ও কৈখালীর শ্যামনগর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। দুলাভাই বাহিনী তেঁতুলতলার চর, কলমিলতার খাল, মুরলী খাল, খাশিটানা খাল, ডাকাতিয়া খাল ও আন্ধারমানিক খাল এলাকায় তৎপর।
এ ছাড়া বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী মড়ুলি খাল, কুঞ্জে খাল, কাগাদোবেকী, পাটকোস্টা ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। দয়াল বাহিনী বড়লক্ষ্মী, মালঞ্চ, ফিরিঙ্গি নদী, দোবেকি, জোড়া বয়সিং হরিণগর, মান্দারবাড়ি, পুষ্পকাঠি, জলঘাটা, মেঘনা খাল ও কলাগাছিয়া এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের সামাজিক পুনর্বাসনের ঘাটতি এবং স্বার্থান্বেষী মহলের মদদ জলদস্যুদের পুনরুত্থানকে সহজ করেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে সুন্দরবনের দস্যুতায় বড় ধরনের ভাটা পড়ে। আত্মসমর্পণ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩৩০ জন দস্যু অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারিতে তখন নদীপথে নিরাপত্তা ফিরে আসে।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের কিছু এলাকায় আবারও দস্যুতা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মো. সিয়াম-উল-হক বলেন, নতুন কোনো দস্যু বাহিনী যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য সুন্দরবনে গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত টহল অভিযান জোরদার করা হয়েছে।