
লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা–ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আগামী ১ মার্চ থেকে এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ থাকবে। এতে যুক্তরাজ্যের নর্থ ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে বসবাসরত লাখো সিলেটি প্রবাসীর দেশে যাতায়াত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এটি প্রথমবার নয়—২০১২ সালে উড়োজাহাজস্বল্পতার কারণে ঢাকা–ম্যানচেস্টার রুট বন্ধ করা হয়েছিল। দীর্ঘ আট বছর পর প্রবাসীদের দাবির মুখে ২০২০ সালের শুরুতে সিলেট–ম্যানচেস্টার ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়। সরাসরি যাতায়াতের সুবিধায় অল্প সময়ের মধ্যেই রুটটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং লাভজনক রুট হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে চালুর পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আবারও স্থগিতের সিদ্ধান্ত আসায় প্রবাসীদের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কোনো বাণিজ্যিক ব্যর্থতার কারণে নয়। বরং হজ অপারেশন, উড়োজাহাজের ঘাটতি ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে ‘অপারেশনাল সমন্বয়’-এর অংশ হিসেবেই রুটটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন,
“উড়োজাহাজস্বল্পতা, আসন্ন হজ কার্যক্রম, বিদ্যমান উড়োজাহাজের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং নেটওয়ার্কজুড়ে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি জানান, হজ মৌসুমে হাজার হাজার হজযাত্রী পরিবহনের জন্য বিপুলসংখ্যক বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়। এই চাপ সামাল দিতে গিয়ে কিছু রুটের ফ্রিকোয়েন্সি কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।
তবে বিমানের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন প্রবাসীরা। এনআরবি সোসাইটি ইউকের নেতারা বলেন, ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বন্ধ হলে বার্মিংহাম, নিউক্যাসল, সান্ডারল্যান্ড, গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও স্কটল্যান্ড অঞ্চলের সিলেটি প্রবাসীরা বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়বেন।
সংগঠনের পরিচালক মোহাম্মদ আহমদ জুনেদ বলেন,
“হজ অপারেশনের অজুহাতে একটি লাভজনক রুট বন্ধ করার কোনো যুক্তি নেই। প্রয়োজনে উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া যেত। তা না করে প্রবাসীদের সরাসরি যাতায়াত বন্ধ করা অযৌক্তিক।”
বিমান সূত্র জানায়, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে এক লাখের বেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে যান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁদের পরিবহনের জন্য নিয়মিত শিডিউল ফ্লাইটের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিশেষ হজ ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়।
এই সময় একাধিক ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পুরোপুরি হজ অপারেশনে নিয়োজিত থাকে। ফলে অন্যান্য দীর্ঘপথের রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমানো বা সাময়িকভাবে বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প থাকে না বলে জানান কর্মকর্তারা। হজ ফ্লাইটে বিলম্ব বা বাতিল হলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও ধর্মীয় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তারা।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোতে যাত্রীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দুবাই, জেদ্দা, রিয়াদ, দোহা, দাম্মাম ও মাস্কাট রুটে প্রায় প্রতিটি ফ্লাইটই পূর্ণ থাকে। এসব রুট বিমানের প্রধান রাজস্ব উৎস।
বিমান কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি ঢাকা–দুবাই বা ঢাকা–জেদ্দা ফ্লাইট দিনে একাধিকবার চালানো সম্ভব হলেও ম্যানচেস্টার রুটে একটি উড়োজাহাজ দিয়ে সপ্তাহে মাত্র দুই থেকে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করা যায়। সীমিত বহর কোথায় ব্যবহার করলে যাত্রীসেবা ও আর্থিক ভারসাম্য বজায় থাকবে—সেই বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিমান বর্তমানে দীর্ঘপথের রুটে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও বোয়িং ৭৭৭ ব্যবহার করছে। ম্যানচেস্টার একটি দীর্ঘপথের রুট হওয়ায় একটি উড়োজাহাজ সেখানে যুক্ত থাকলে সেটি প্রায় দুই থেকে তিন দিন অন্য রুটে ব্যবহার করা যায় না।
একই সময়ে ওই উড়োজাহাজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তিন থেকে চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বিমান। বর্তমানে বিমানের ২১টি উড়োজাহাজের বহরের কয়েকটি বড় উড়োজাহাজ দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় সচল বিমানের সংখ্যা কমে গেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় রুটে বাড়তি পাইলট ও কেবিন ক্রুর প্রয়োজন হওয়ায় জনবল সংকটও তৈরি হয়েছে।
বিমানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ৪৩ হাজার ৯১৮ মেট্রিক টন কার্গো পরিবহন করে ৯২৫ কোটি টাকা আয় করে বিমান।
এই অবস্থায় লাভজনক ম্যানচেস্টার রুট বন্ধ করাকে এভিয়েশন বিশ্লেষকরা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন।
বিমানের সাবেক বোর্ড সদস্য ও এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন,
“মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলো আয়ের বড় উৎস হলেও ইউরোপীয় রুটগুলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বারবার রুট বন্ধ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি অবহেলা বা অদক্ষতার ফল নয়। বরং বহর, যাত্রীচাহিদা, নিরাপত্তা ও ক্রু ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া একটি সাময়িক ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং বহর ও জনবল সংকট কাটলে ঢাকা–ম্যানচেস্টার রুট পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে বিমান। তবে আপাতত ১ মার্চ থেকে প্রবাসীদের লন্ডন রুট বা বিকল্প এয়ারলাইনস ব্যবহার করেই যাতায়াত করতে হবে।