
ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডে অবস্থিত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি থেকে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়। ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়াকে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
উচ্ছেদের সময় ধারণ করা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, অভিযানে অংশ নেওয়া এক সেনা কর্মকর্তা খালেদা জিয়াকে বলেন, “আপনি বের হয়ে আসেন, না হলে জোর করে নিয়ে আসব।” তখন খালেদা জিয়া বেডরুমে বসে ছিলেন এবং বলছিলেন, “এটা আমার বাড়ি, আমাকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।”
উচ্ছেদের পর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আমাকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।”
২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে বাড়িটির ইজারা বাতিল করে। সরকার দাবি করে, ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ছিল এবং সেনানিবাস এলাকায় রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া নিয়মবহির্ভূত। ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই উচ্ছেদ নোটিস জারি করা হয়।
খালেদা জিয়ার করা আবেদনের শুনানি ছাড়াই তৎকালীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। ওই বেঞ্চের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। বিচারপতি মোজাম্মেল হক ও সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাও সেই বেঞ্চে ছিলেন।
শেখ হাসিনা
খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি নিজেই এই উচ্ছেদকে ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তারিক আহমেদ সিদ্দিক
সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে উচ্ছেদের সামগ্রিক পরিকল্পনা, সেনাবাহিনীর ভেতরের প্রতিক্রিয়া মোকাবিলা ও ডিজিএফআই ব্যবহারের কৌশল নির্ধারণে তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
এ বি এম খায়রুল হক
শুনানি ছাড়াই উচ্ছেদ বৈধ করার রায়ের মাধ্যমে তিনি বিচার বিভাগের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করেন বলে সমালোচনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়।
এস কে সিনহা ও মোজাম্মেল হক
আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে উচ্ছেদের রায় প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও ভূমিকায় বিতর্কিত হন তারা।
নাজমুন আরা সুলতানা
উচ্ছেদসংক্রান্ত আদালত অবমাননার মামলা শুনানিতে না নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিতর্কে জড়ান।
মোহাম্মদ আবদুল মুবীন
তৎকালীন সেনাপ্রধান হিসেবে সেনাবাহিনীর ভেতরে প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে তিনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সমর্থন দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিজিএফআই ও সামরিক কর্মকর্তারা
ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান মোল্লা ফজলে আকবর ও এডিজি শেখ মামুন খালেদ পুরো অপারেশন সমন্বয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরাসরি অভিযানে নেতৃত্ব দেন লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান।
উচ্ছেদের পরপরই কিছু গণমাধ্যমে ‘মদ উদ্ধার’সহ নানা বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। এসব প্রতিবেদন ও কলামের মাধ্যমে উচ্ছেদকে ন্যায্য দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
মইনুল রোডের বাড়িটি ছিল জিয়াউর রহমান পরিবারের আবেগ ও ইতিহাসের কেন্দ্র। ১৯৭২ সাল থেকে জিয়াউর রহমান সেখানে বসবাস করেন। ১৯৮১ সালে তার শাহাদতের পর জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তে বছরে এক টাকা খাজনায় বাড়িটি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই উচ্ছেদ কেবল একটি বাড়ি হারানোর ঘটনা নয়—বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা, বিচার ও প্রশাসনের সমন্বিত ব্যবহারের একটি নজির হিসেবেই এটি আজও আলোচিত।