
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক তরুণের মৃত্যুদণ্ড ঘিরে নতুন করে ভয়াবহ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছে, কোনো বিক্ষোভকারীর ফাঁসি কার্যকর হলে ইরানের বিরুদ্ধে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে। তবে এসব হুমকি উপেক্ষা করেই ২৬ বছর বয়সি বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানিকে ফাঁসিতে ঝুলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।
এরফানের পরিবার জানিয়েছে, বুধবার তার ফাঁসি কার্যকর হতে পারে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাকে পরিবারের সঙ্গে মাত্র ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। যদিও ইরানে চলমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বা ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের কারণে বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকরের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, যদি এরফানকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তাহলে বিশ্ব ‘বড় কিছু’ প্রত্যক্ষ করবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে অনেকেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, তেহরানও পালটা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
এরফান সোলতানি তেহরানের নিকটবর্তী কারাজ শহরের ফারদিস এলাকার বাসিন্দা। সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় ৮ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই দিনের মধ্যেই তার বিচার সম্পন্ন করা হয় এবং ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ইরান হিউম্যান রাইটস ও ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেসি ইন ইরান জানিয়েছে, এত দ্রুত বিচার ও দণ্ডাদেশ দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও বলছে, এরফানকে কোনো আইনজীবী নিয়োগ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, চলমান বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে এরফানই প্রথম, যার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছে। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, একই অভিযোগে আরও বহু বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে।
এরফানের পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, এক নিকটাত্মীয় আইনজীবী তার পক্ষে মামলা লড়তে চাইলেও নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হুমকি দিয়ে বাধা দেয়। পরিবারকেও সতর্ক করা হয়েছে—গণমাধ্যমে কথা বললে বা বিষয়টি প্রকাশ্যে আনলে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য ‘সাহায্য আসছে’। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকৃতি জানান। ট্রাম্পের এই বক্তব্য নতুন করে সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প ইরানের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছেন এবং দেশটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে সহিংস অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৬০০ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। যদিও ইরানের একজন কর্মকর্তা নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার বলে দাবি করেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংঘাত আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।