
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে চলমান আসন সমঝোতা আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। বুধবার রাত পর্যন্ত একাধিক বৈঠক হলেও দুই দলের মধ্যে মতভেদ কাটেনি। এর ফলে জামায়াতসহ ১১ দলের আসন বণ্টনের চূড়ান্ত ঘোষণা স্থগিত করা হয়েছে।
এই অচলাবস্থার কারণে বুধবার বিকেলে নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনও শেষ মুহূর্তে বাতিল করে জামায়াতে ইসলামী। বেলা সাড়ে চারটায় সংবাদ সম্মেলনের কথা থাকলেও বেলা সোয়া দুইটার দিকে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে তা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সমঝোতা আলোচনার সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, “এখনো কিছু প্রস্তুতি বাকি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের তারিখ জানানো হবে।” তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়।
ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে জোটগত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। “যারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ডেকেছে, তারাই স্থগিত করেছে। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই,”—বলেন তিনি। পরে দলটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, ইসলামী আন্দোলনের আমির সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করতে কাউকে অনুরোধ করেননি।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ইসলামী আন্দোলন ৫০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে চায়। বিপরীতে জামায়াত সর্বশেষ আলোচনায় ৪৫টি আসনে ছাড় দিতে রাজি হলেও বাকি পাঁচটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দেয়। সেখানে ইসলামী আন্দোলন ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩০টি আসন উন্মুক্ত রাখার দাবি তোলে, যা জামায়াত গ্রহণ করেনি।
ইসলামী আন্দোলনের আশঙ্কা, জামায়াত যদি শেষ পর্যন্ত ১৯০টি আসনে নির্বাচন করার বিষয়ে অনড় থাকে, তাহলে তারাও ৬০ থেকে ৭০টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পথে হাঁটতে পারে। এই অবস্থান থেকেই দলটি বিকল্প জোট বা নতুন সমঝোতার কথা ভাবছে।
সমঝোতা ব্যর্থ হলে ইসলামী আন্দোলন অন্য দলগুলোকে নিয়ে আলাদা জোট গঠনের চিন্তাও করছে। দলটির একাধিক সূত্র জানায়, তারা ইতোমধ্যে আটটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, এবি পার্টি ও জাগপা। পাশাপাশি বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জামায়াতকে ১৫০ আসনে সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি করানোর চেষ্টাও করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বাকি দলগুলোকে নিয়ে নতুন করে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছে দলটি।
অন্যদিকে জামায়াতের একটি সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলন শুধু আসনসংখ্যা নয়, সম্ভাব্য সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান কে হবেন—তা আগেভাগেই স্পষ্ট করতে চায়। জামায়াত মনে করে, এখনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নয়।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ইসলামী আন্দোলন যদি তাদের ক্ষোভ ও অনড় অবস্থান থেকে সরে আসে, তাহলে জামায়াত অপেক্ষা করবে। না হলে তাদের ছাড়াই সমঝোতার পথ খোলা আছে।”
এর আগে মঙ্গলবার রাতে ইসলামী আন্দোলনের শুরা কাউন্সিলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় আসনসংখ্যা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন তৃণমূল নেতারা। দলটির দাবি, ‘ওয়ান বক্স’ নীতিতে তারা শুরু থেকেই কাজ করছিল, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত জামায়াত এককভাবে নিয়েছে, যা আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী দলগুলোর সম্ভাব্য জোটে অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত আলোচনার সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয় কি না—তা এখনো অনিশ্চিত।