
দুর্বল তদন্ত, সাক্ষীর অভাব এবং বাদি-বিবাদির আপস—এই তিন কারণে দেশে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে বহু চাঞ্চল্যকর খুনের মামলা। আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৩ বছর পার হলেও এখনো খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন ও ত্বকী হত্যা মামলাও আজও বিচারিক নিষ্পত্তির বাইরে রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব মামলার দীর্ঘসূত্রতা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও চার্জশিট না হওয়ায় কিংবা প্রমাণের ঘাটতিতে আসামিরা আদালত থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কার্যত বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো। এক জেলার মামলার আসামি অন্য জেলায় অবস্থান করায় তদন্তে জটিলতা বাড়ছে। কোথাও সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপে আপস হয়ে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে করে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারও দীর্ঘদিন ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার প্রায় ৫২ শতাংশেই অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায় না। ফলে অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল জানান, প্রমাণের অভাব, সাক্ষীর অনাগ্রহ এবং তদন্ত ত্রুটিই খালাসের প্রধান কারণ।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে শতাধিক মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তবে দ্রুত বিচার শুরু করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চার্জশিট গ্রহণে বিলম্ব হলে পলাতক আসামিদের গ্রেফতার কঠিন হয়ে পড়ে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন কঠোর হলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় সাক্ষীরা হুমকি ও ভয়ভীতির কারণে আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক গাফিলতিও তদন্তকে দুর্বল করে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল মামলায় একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ তদন্ত সেল গঠন করা জরুরি। এতে তদন্তের মান বাড়বে এবং বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, তদন্তে স্বচ্ছতা এবং সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার দীর্ঘসূত্রতার দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসবে না।