
জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা ও প্রতিপক্ষ দমনে অপরাধী চক্রগুলো আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক গুলি ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে পেশাদার ‘শুটার’ ও কিলার গ্রুপ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক মাঠের বাইরেও অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) একাধিক জরুরি বৈঠক করলেও মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমনে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনি রাজনীতিকে ঘিরে অপরাধীদের ‘ভাড়াটে পেশিশক্তি’ হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা এখন বাস্তব রূপ নিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামান্য শিথিলতাও অপরাধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা বাড়ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর ফার্মগেটের তেজতুরি বাজার এলাকায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বির হত্যাকাণ্ডে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, তারা পেশাদার কিলার গ্রুপের সদস্য। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এটি চুক্তিভিত্তিক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে উঠে এসেছে।
এর আগে রাজধানীর আদালত এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন হত্যা এবং চট্টগ্রামে ভোটের মাঠে সারওয়ার হোসেন বাবলা হত্যাকাণ্ড—এই ঘটনাগুলোও আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধমূলক হামলার উদাহরণ হিসেবে তদন্তে চিহ্নিত হয়েছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, মোসাব্বির হত্যাকাণ্ডে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিদেশে পলাতক দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেন। প্রথমে ভারতে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, পরে মালয়েশিয়া পলাতক দাদা বিনাশ ওরফে দীলিপের মাধ্যমে কিলিং মিশন সম্পন্ন হয়।
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় যাওয়ার সময় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনাতেও একই ধরনের পেশাদার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এই ঘটনার পর রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত নয়টি গুলি ও হত্যাকাণ্ডে একই নেটওয়ার্কের যোগসূত্র পাওয়া গেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তবে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সরাসরি মাঠে না নেমে আড়াল থেকে পুরো অপারেশন নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন আসনে প্রার্থীদের ঘিরে অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। মিরপুর, পল্লবী ও ভাসানটেক এলাকায় নতুন গজিয়ে ওঠা ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ ইতোমধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ–২’। ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অভিযানে ১৬ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার হলেও শীর্ষ ও পেশাদার সন্ত্রাসী ধরতে বড় সাফল্য আসেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সক্রিয়তা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।