
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতায় অন্তত দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে দেশটির সরকার। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান এই বিক্ষোভকে ইরানের জন্য সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনে কমপক্ষে দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য উভয়ই রয়েছেন। তবে নিহতদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা সংখ্যা আলাদা করে জানানো হয়নি।
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, এই প্রাণহানির জন্য ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ দায়ী। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন।
অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের চাপে জনজীবনে নেমে আসা দুর্ভোগ থেকেই এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। চলমান আন্দোলনকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির ধর্মীয় শাসকদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার একদিকে অর্থনৈতিক সংকটের বাস্তবতা স্বীকার করলেও অন্যদিকে কঠোর নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই বিক্ষোভে উসকানি দিচ্ছে।
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি সামরিক মানের জ্যামার ব্যবহার করে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংক ইন্টারনেট ব্যবস্থাও অচল করে দেওয়া হয়েছে। গত এক সপ্তাহে রাতে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের একাধিক ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে, যার সত্যতা যাচাই করেছে রয়টার্স। ভিডিওগুলোতে গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানে থাকা সব মার্কিন নাগরিককে দ্রুত দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মার্কিন নাগরিকরা জিজ্ঞাসাবাদ, গ্রেপ্তার ও আটক হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। এমনকি কেবল মার্কিন পাসপোর্ট বহন করাও আটকের কারণ হতে পারে। দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের ক্ষেত্রে শুধু ইরানি পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সোমবার তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরান যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে আলোচনার পথও খোলা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।”
একই সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ইরান হিউম্যান রাইটস ও ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেসি ইন ইরানের তথ্য অনুযায়ী, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ২৬ বছর বয়সী ইরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ অভিযোগ আনা হয়েছে, যা ইরানে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, যুদ্ধের প্রস্তুতির ঘোষণা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরান পরিস্থিতি দ্রুত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।