
শর্ত পূরণ না হওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’ যথাযথভাবে উপস্থাপন না করার অভিযোগে প্রায় ১৫ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার ভিডিও সাক্ষাৎকার বাতিল করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এসব ভিডিও সংরক্ষণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজে যুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো বিল পরিশোধও করা হবে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, বাতিল হওয়া ভিডিওগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে অসংগতি রয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে উঠে আসেনি। এসব ভিডিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গেলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে—এ আশঙ্কায় সেগুলো বাতিল করা হয়েছে।
শুধু ভিডিও সাক্ষাৎকার নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকার পুরো প্রকল্পটিই বাতিল করা হয়েছে। ২০২২ সালে ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ শিরোনামে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। লক্ষ্য ছিল জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয় ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
এই প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র, সমসংখ্যক ইউটিউব কনটেন্ট এবং ১৬টি পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টারি তৈরির পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। তবে তার আগেই ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি কার্যত থমকে যায়।
নথি অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের ভিডিও সাক্ষাৎকার ধারণের কাজ পায় ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমটিআই)। ২০২৩ সালের ১৬ মে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় নির্দিষ্ট ১৯টি প্রশ্ন অনুসরণ করার কথা ছিল। এর মধ্যে কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, কার নির্দেশে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, প্রশিক্ষণ ও সম্মুখযুদ্ধের অভিজ্ঞতা—এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাতিল হওয়া ভিডিওগুলোতে এসব মানদণ্ড মানা হয়নি। কোথাও কাঠামোগত ঘাটতি ছিল, কোথাও ভিডিও ও শব্দের মান নির্ধারিত মানদণ্ডে পৌঁছায়নি।
এমটিআই এ পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৪২৮টি ভিডিও জমা দেয়। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৮৮টি আগের সরকারের সময়ে গ্রহণ করে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিও বাতিল করা হয়।
এমটিআইয়ের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আজমল কবির রাব্বি দাবি করেন, ভিডিও বাতিলের সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্যমূলক। তাঁর প্রশ্ন, আগের ১২ হাজারের বেশি ভিডিও যদি মানসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী ভিডিওগুলো হঠাৎ করে অযোগ্য হয় কীভাবে। তিনি অভিযোগ করেন, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাতিল হওয়া ভিডিওগুলো কোনোভাবেই সংরক্ষণ করা হবে না এবং প্রকল্পের জন্য আর কোনো অর্থ ব্যয় করা হবে না।