
আজ ১৩ জানুয়ারি—বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এক অনন্য ও উজ্জ্বল নক্ষত্র, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সর্বজনস্বীকৃত কণ্ঠশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার জন্মদিন। যাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, যাঁর গায়কী শুদ্ধতা, সংযম ও গভীর ভাবব্যঞ্জনার কারণে রবীন্দ্রসঙ্গীত পেয়েছে এক মর্যাদাশীল উচ্চতা—তিনি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।
১৯৫৭ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ও মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। খুব অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। কবিগুরুর ভাব, ভাষা ও সুরের সঙ্গে যেন তাঁর আত্মার এক নীরব সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয় আজীবন সাধনায়।
রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁর দীক্ষা ও সাধনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শুদ্ধতা। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে গ্রহণ করেছেন জীবনবোধ, দর্শন ও আত্মিক অনুশীলনের অংশ হিসেবে। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত কখনো গভীর আবেগে স্পর্শ করে, কখনো চিন্তাশীল দার্শনিকতায় মনকে স্থির করে, আবার কখনো প্রকৃতি ও মানবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক অনন্য দলিল হয়ে ওঠে।
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন-এর আদর্শ ও শুদ্ধ ধারার অনুসারী হয়ে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করে আসছেন। এই ধারাবাহিকতা ও নিষ্ঠাই তাঁকে বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করেছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের নানা দেশে তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে।
কণ্ঠশিল্পীর পরিচয়ের পাশাপাশি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা একজন সংগীত শিক্ষিকা ও সাংস্কৃতিক পথপ্রদর্শক। শুদ্ধ সংগীতচর্চা ও নতুন প্রজন্মকে সঠিক ধারায় গড়ে তুলতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুরের ধারা’। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বহু শিল্পী রবীন্দ্রসঙ্গীতের শুদ্ধ রীতি, উচ্চারণ ও ভাবার্থ শিখে আজ দেশে ও বিদেশে সংগীতচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
দীর্ঘ সংগীত সাধনা ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০১৬ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এরপর ২০২৪ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী লাভ করেন। এই দুটি রাষ্ট্রীয় সম্মানই প্রমাণ করে, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা কেবল বাংলাদেশের নন, তিনি উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিনিধি।
আজ তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় তাঁর নিরলস সাধনা, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা ও সংগীতের প্রতি আজীবন নিবেদনের কথা। তিনি প্রমাণ করেছেন—শিল্প যদি হয় শুদ্ধ সাধনা, তবে তা কালের সীমা অতিক্রম করে চিরন্তন হয়ে ওঠে।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা—রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক অনিঃশেষ আলোকবর্তিকা।