
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি আবাসিক হলের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ ও ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হল’-এর নতুন নাম হবে যথাক্রমে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ এবং ‘বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হল’।
ডাকসুর নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের দাবির পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে শেখ রাসেল টাওয়ার, বঙ্গবন্ধু টাওয়ার এবং ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজির সুলতানা কামাল হোস্টেলের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও একটি অংশের শিক্ষার্থী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যদি ফ্যাসিবাদী বা বিতর্কিত রাজনৈতিক আইকন সরানোই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারদা সূর্যসেন হল এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হল কেন বহাল থাকছে?
ডাকসুর এক সম্পাদক সমাবেশে বলেন, “শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর তার পিতার প্রতীকগুলো ঢাবিতে রাখা যাবে না। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গণহত্যা সমর্থনকারী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।”
এ প্রসঙ্গে সমালোচকদের একটি অংশ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন তুলছেন। তাদের যুক্তি অনুযায়ী, সূর্যসেন ও প্রীতিলতা উভয়েই ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা রাষ্ট্রীয় আন্দোলনের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই—এমন দাবি তুলছেন তারা।
তারা আরও বলেন, অতীতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলের নাম পরিবর্তন করে সূর্যসেন হল এবং ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল করা হয়েছিল, যার পেছনে সুস্পষ্ট নীতিগত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে দার্শনিক ও কবি আল্লামা ইকবালের নাম বাদ দেওয়াকে তারা ঐতিহাসিক অসামঞ্জস্য হিসেবে দেখছেন।
এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও আদর্শ কী হওয়া উচিত। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সুবিচারের কথা থাকলেও পরবর্তীতে সংবিধানে যুক্ত হওয়া আদর্শিক সংযোজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে।
সাম্প্রতিক পাঠ্যক্রম সংস্কার, বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা শব্দ বাদ দেওয়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন—এসব পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে তাদের মতে, নামকরণ ও জাতীয় প্রতীক নির্ধারণে একটি সুস্পষ্ট, ঐতিহাসিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা এখনো অনুপস্থিত।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, “কিছু নাম বদলানো হয়েছে, কিছু রয়ে গেছে—এই অসম্পূর্ণতা ভবিষ্যতে আরও বিতর্ক তৈরি করবে। এখন সময় এসেছে জাতি হিসেবে আমরা কারা এবং কোন আদর্শে দাঁড়াতে চাই—সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার।”