
প্রায় এক দশক পর মিয়ানমারের ধর্মীয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো নৃশংস অভিযানের বিচার শুরু হয়েছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে)। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত এই আদালতে সোমবার (১৩ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে মামলাটির শুনানি শুরু হয়, যা টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, মিয়ানমার সংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান এই শুনানির সূচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর মতে, এই বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত ঘটে ২০১৭ সালের মধ্যভাগে। ওই সময় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও সেনা ছাউনিতে হামলার ঘটনার পর দেশটির সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। অভিযানের সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, গ্রাম পোড়ানো এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ ওঠে। জীবন বাঁচাতে ওই সময় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
জাতিসংঘের একটি প্রাথমিক তদন্ত দল সেই অভিযানকে সরাসরি ‘গণহত্যামূলক তৎপরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যেই এই সহিংসতা চালানো হয়। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে।
মামলা দায়েরের সময় মিয়ানমারে বেসামরিক সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অং সান সু চি। সে সময় তিনি জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের অভিযোগগুলোকে ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ‘অতিরঞ্জিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেন। তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন।
আইসিজেতে শুরু হওয়া এই বিচার প্রক্রিয়াকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা নিকোলাস কৌমজিয়ান মনে করেন, এই শুনানি শুধু মিয়ানমারের জন্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী গণহত্যার সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এ ধরনের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশা করছে, এই বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় নিরূপণ হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে বিশ্ব সম্প্রদায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে।