
বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করে বাণিজ্য সুবিধা নিতে প্রায় ৫০ বছর আগের একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ট্রানজিট সুবিধা চাইছে পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল। একই সঙ্গে নেপাল থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। দুই দেশের এই চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে ঢাকায় আগামীকাল থেকে দুই দিনব্যাপী বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক শুরু হচ্ছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং নেপালের পক্ষে দেশটির শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সচিব রাম প্রসাদ ঘিমিরে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ট্রানজিট ও বিদ্যুৎ ইস্যুর পাশাপাশি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), পর্যটন সংযোগ এবং আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে থাকছে।
জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে নেপালে পণ্য রপ্তানি হয় এবং নেপালের আমদানি করা পণ্য ভারতীয় ভূখণ্ড অতিক্রম করে ‘ট্রাফিক ইন ট্রানজিট’ হিসেবে পরিবহন করা হয়। এই চুক্তির অধীনে রেলপথে ছয়টি রুট অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তবে মূলত দুটি রুট ব্যবহৃত হচ্ছে। রুট দুটি হলো—রোহনপুর (বাংলাদেশ)–সিঙ্গাবাদ (ভারত) এবং বিরল (বাংলাদেশ)–রাধিকাপুর (ভারত)।
নেপাল এখন এই বিদ্যমান চুক্তির আওতায় রেলপথের পাশাপাশি নৌপথেও ট্রানজিট সুবিধা চাচ্ছে। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদারে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে বিবিআইএন চুক্তি রয়েছে এবং ২০২২ সালে বাংলাদেশ নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রিসভার অনুমোদন দেয়। তবে নেপালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বিবিআইএনের পরিবর্তে পুরোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতাতেই ট্রানজিট সুবিধা নিতে আগ্রহী।
বর্তমানে নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। গত বছরের ৩ অক্টোবর নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় এই বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। এবার এই চুক্তির ধারাবাহিকতায় নেপাল থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রিফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ) চূড়ান্ত করার বিষয়টি বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচি। ২০১৫ সাল থেকে এ নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চুক্তিটি কার্যকর হয়নি। ভুটানের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে নেপালের সঙ্গে পিটিএ বাস্তবায়নে আগ্রহী বাংলাদেশ।
এ ছাড়া দুই দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে কক্সবাজার ও নেপালের পর্যটন নগরী পোখরার মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে নেপাল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ জন্য কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি লেনদেন ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বাংলাদেশ চাইছে নেপালের সঙ্গে সরাসরি একটি দ্বিপক্ষীয় পেমেন্ট সিস্টেম চালু করতে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে দুই দেশ একসঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করতে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ও আর্থিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়াও বৈঠকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য নেপালের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নেপালের পক্ষ থেকে তাদের পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক কমানোর বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।