
চলতি শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। এতে ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, স্বাধীনতা-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিস্তারিত বিবরণ।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের প্রণীত শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় এবার ইতিহাসভিত্তিক পাঠ্যবইয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাবলি নতুনভাবে সংযোজন করা হয়েছে।
এর আগে বাংলা ও ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে সাহিত্য অংশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য সংযোজিত হলেও এবার ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ইতিহাসের অংশ হিসেবে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী বিষয়বস্তুর গভীরতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হলেও সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণিতে বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন’ অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণআন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে নতুন পাঠ সংযোজন করা হয়েছে। এখানে ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদের ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ অধ্যায়ের অধীনে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে আলাদা পাঠ যুক্ত হয়েছে। সেখানে এরশাদবিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।
নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ে স্বাধীনতার পর জনগণের প্রত্যাশা, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিক ব্যর্থতার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, বিরোধী মত দমন এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে নির্বাচনী সংকট তৈরি হয়। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়। ২০২৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনাও জনগণ প্রত্যাখ্যান করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দমন করতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় সংগঠনগুলোর সহিংস ভূমিকা পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণমুখী করে তোলে। শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনার পর আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, অতিরঞ্জিত ও একমুখী উপস্থাপন বাদ দিয়ে তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরাই এই পরিমার্জনের উদ্দেশ্য। এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর জানান, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির অনুমোদনের মাধ্যমেই পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তন চূড়ান্ত করা হয়েছে, যাতে আগামী প্রজন্ম বাংলাদেশের ইতিহাস সঠিক ও প্রামাণ্যভাবে জানতে পারে।