
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। বিদেশে পলাতক এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং ব্যবসায়িক বিরোধ থেকেই এই খুন সংঘটিত হয়েছে।
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার চারজন হলেন— মো. বিল্লাল, আব্দুল কাদির, মো. রিয়াজ ও জিন্নাত। তাদের মধ্যে বিল্লাল ও আব্দুল কাদির আপন দুই ভাই। এ ছাড়া তাদের আরেক ভাই আব্দুর রহিম বর্তমানে পলাতক, যিনি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত। তিন সহোদরের বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার গগুলা গ্রামে।
ডিবি জানায়, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে ‘সুইডেন আসলাম’-এর ঘনিষ্ঠজন বিনাশ মালয়েশিয়া থেকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে এই হত্যার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন বিল্লাল। অর্থের লোভে তিনি নিজের দুই ভাই কাদির ও রহিমকে কিলিং মিশনে যুক্ত করেন। পরে জিন্নাত ও রিয়াজসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে হত্যার ছক আঁকা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, মুছাব্বির প্রায় প্রতিদিন রাতে কারওয়ান বাজারের বিপরীতে স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে দলীয় কর্মী ও পরিচিতজনদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। এই রুটিন আগেই জানা ছিল আসামিদের। হত্যার আগের দিন রিয়াজের সহায়তায় স্টার হোটেল এলাকা এবং আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলি রেকি করা হয়।
ঘটনার দিন বুধবার রাত সোয়া ৮টার দিকে শ্যুটার জিন্নাত ও রহিম গলির অন্ধকার অংশে অবস্থান নেন। বিল্লাল মোটরসাইকেলে করে তাদের সেখানে নামিয়ে দেন এবং নিজে কাছাকাছি প্রধান সড়কে অবস্থান করেন। মুছাব্বির ও কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুফিয়ান বেপারি মাসুদ ওই গলি দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন মুছাব্বির এবং গুরুতর আহত হন মাসুদ, যিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে কারওয়ান বাজারের ভিড়ে মিশে যায়। ডিবি জানিয়েছে, হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে একটি নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল ও ৬ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে, যা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, কারওয়ান বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন খাত থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা ওঠে। এই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অতীতেও সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ এই দ্বন্দ্বের জেরেই মুছাব্বিরকে টার্গেট করা হয়।
তিনি আরও বলেন, মুছাব্বির সম্প্রতি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছিলেন এবং ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাও তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন। এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এ ঘটনায় মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার চারজনকে সোমবার আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।