
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত শতবর্ষের পুরোনো অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট–১৯২৩ অনুসরণ করে রাষ্ট্রের ‘গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর’ তথ্য গোপন রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা এই নির্দেশনা নিয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে, যা অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট–১৯২৩-এর পরিপন্থি। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।
আদেশে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের তথ্য ফাঁস বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মনিটরিং জোরদার করতে হবে এবং তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই নির্দেশনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে এসে ১৯২৩ সালের একটি আইন কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া কার্যত তথ্য গোপনের পুরোনো সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার শামিল। তাঁদের মতে, এই অবস্থান স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি।
একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দেশে বর্তমানে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর রয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন তথ্য ছাড়া অন্যান্য সরকারি তথ্য প্রকাশে বাধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। অথচ সচিবালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন নির্দেশনা বিতর্ক তৈরি করেছে।
তাঁরা আরও জানান, একটি নথির অনুলিপি একাধিক দপ্তরে যায়। ফলে কোথা থেকে তথ্য ফাঁস হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। এই অবস্থায় চাকরি আইন অনুযায়ী শাস্তির হুমকি প্রশাসনের ভেতরে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক প্রতিবেদন রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং সেগুলো প্রশাসনের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে অনেক সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই আদেশ জারির বিষয়ে জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অবস্থান জনপ্রশাসনবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কমিশনের সুপারিশে সরকারি তথ্য উন্মুক্ত করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট–১৯২৩ ও সাক্ষ্য আইন–১৮৭২ সংশোধন করে যুগোপযোগী করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সংবিধানের ৩৯ ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, এই সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার সরাসরি বিরোধ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ব্রিটিশ আমলে উপনিবেশ রক্ষার প্রয়োজনে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান ও তথ্য অধিকার আইন জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে শতবর্ষের পুরোনো এই আইন বর্তমান বাস্তবতায় প্রযোজ্য নয়।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, কেবল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সীমিত তথ্য ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত না করলে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত এই নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা করা এবং সংবিধান ও সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা।