
বিশ্বে পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। এক দশক আগেও যেখানে দেশটির অবস্থান ছিল দশম, সেখানে উৎপাদনে এই উল্লম্ফন নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবুও বাস্তবতা হলো—পেঁয়াজে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি বাংলাদেশ। বাজারে বারবার অস্থিরতা, দাম বৃদ্ধি এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
২০১৯ সালে সরকার পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যেই আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল পাঁচ বছরে অন্তত ১০ লাখ টন উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু ২০২৪ সাল শেষ হলেও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বর্তমানে পরিকল্পনার অগ্রগতি বা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি পর্যায়ে তেমন কোনো সক্রিয় আলোচনা নেই। বরং বাজার অস্থির হলেই আলোচনায় আসে নজরদারি জোরদারের কথা, যা সরবরাহ সংকট সমাধানে কার্যকর নয়—এ অভিজ্ঞতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ লাখ টন। বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ ১৭ হাজার টন। তবে মাঠপর্যায়ে পচন, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ এবং পরিবহনজনিত ক্ষতি বিবেচনায় নিলে মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কার্যকরভাবে বাজারে সরবরাহযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ টনের কাছাকাছি। অথচ দেশের বার্ষিক চাহিদা ৩২ থেকে ৩৬ লাখ টন। এই ব্যবধান পূরণ করতেই প্রতি বছর ৫ থেকে ৮ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেঁয়াজ স্বভাবগতভাবেই একটি পচনশীল ফসল। প্রচলিত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলে এর ওজন ১০ থেকে ১২ শতাংশ কমে যায় এবং নষ্ট হয় বড় অংশ। পর্যাপ্ত ও কার্যকর সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় উৎপাদনের বড় অংশ প্রতিবছর অপচয় হয়ে যাচ্ছে। এই অপচয়ই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থির করে তোলে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রধান শর্ত হলো আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা। তবে কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করলে ব্যয় বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সে কারণে গ্রীষ্মকালীন বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদনকে তুলনামূলক নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের মতে, দেশে মূলত শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন—এই দুই মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। উৎপাদন বাড়াতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে জোর দেওয়া হলেও এর উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। বীজ, সার ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ফলে এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ গত বছরের প্রায় ২৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকার ওপরে চলে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সব এলাকার মাটি পেঁয়াজ চাষের উপযোগী নয়। পাবনা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী ও রাজশাহী অঞ্চলে মূলত বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। গত এক দশকে সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে আবাদি জমি প্রায় দ্বিগুণ হলেও উৎপাদন ব্যয়ও সমানতালে বেড়েছে। উপরন্তু দেশের পেঁয়াজ বীজের বড় অংশই আমদানিনির্ভর, আর ভারত দীর্ঘদিন ধরে পেঁয়াজ বীজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন প্রায় ৪৪ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আট লাখ টন। গবেষকেরা বলছেন, নতুন উচ্চফলনশীল জাত সঠিকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে শিগগিরই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব।
গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ‘বারি পেঁয়াজ–৫’ জাতটিকে বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতীয় গড় ফলন যেখানে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১০ দশমিক ৫৬ টন, সেখানে এই জাত থেকে ১৬ থেকে ২২ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে। পাবনার কৃষকেরা এই জাত ব্যবহার করে বিঘাপ্রতি ২০০ মণ পর্যন্ত উৎপাদনের নজির স্থাপন করেছেন।
তবুও বাস্তবতা হলো—উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর উৎপাদিত পেঁয়াজের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয়ই আমদানিনির্ভরতা টিকিয়ে রাখছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানি কিছুটা কমেছে। ২০২০–২১ অর্থবছরে যেখানে প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার টনে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আমদানির প্রয়োজন এক লাখ টনের নিচে নেমে আসতে পারে, এমনকি পুরোপুরি এড়ানোও সম্ভব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, এয়ার-ফ্লো পদ্ধতিতে সংরক্ষণ প্রযুক্তি চালু হওয়ায় আগের তুলনায় অন্তত দুই লাখ টন বেশি পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। এতে ব্যয় কম এবং পচনও তুলনামূলকভাবে কম হয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ আফরোজা চৌধুরীর মতে, পেঁয়াজের বাজার অস্থিরতার পেছনে শুধু উৎপাদন নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও দায়ী। বড় ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ভারতীয় রফতানি পরিস্থিতির অপেক্ষায় পেঁয়াজ মজুদ করে রাখেন, ফলে বাস্তব সংকটের চেয়ে কৃত্রিম সংকটই বেশি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পেঁয়াজে টেকসই স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ৩০ শতাংশ অপচয় কমাতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চফলনশীল জাত, বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কৃষক প্রণোদনা ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তার—এই সব কটি ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করতে হবে। নইলে উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থান অর্জন করেও বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি থেকে যাবে আগের মতোই।