
জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রভাব আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তথাকথিত ‘ক্যারিয়ার রাজনীতিকদের’ তুলনায় ব্যবসায়ীরা এবারও এগিয়ে রয়েছেন।
৩০০ আসনের এই নির্বাচনের জন্য শুরুতে ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে জমা পড়ে ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৯০ জন এবং ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। আপিলের পর আরও কিছু প্রার্থী বৈধতা ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।
৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে ৮১৪ জনের পেশা ব্যবসা। অর্থাৎ মোট বৈধ প্রার্থীদের ৪৪ শতাংশেরও বেশি ব্যবসায়ী। দলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়ী প্রার্থী রয়েছে বিএনপির—১৯৪ জন। এরপর রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৯৬ জন, জাতীয় পার্টির ৮৯ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন, গণঅধিকার পরিষদের ৪২ জন, খেলাফত মজলিসের ২৬ জন, এনসিপির ১৬ জন, এবি পার্টির ৮ জন এবং খেলাফত আন্দোলনের ৩ জন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নে ব্যবসায়ীদের এই বাড়তি গুরুত্ব ইতিবাচক ইঙ্গিত নয়। তাঁদের ভাষায়, ক্ষমতা ও পুঁজি এখন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে। রাজনীতিকদের ক্ষমতায় যেতে যেমন অর্থনৈতিক সহায়তা দরকার হয়, তেমনি ব্যবসায়ীরাও রাজনৈতিক সুযোগ–সুবিধা প্রত্যাশা করেন। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে এই পারস্পরিক ‘বিনিময়’ প্রক্রিয়ার প্রতিফলনই ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে।
হলফনামা বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, রাজনীতিই একমাত্র পেশা—এমন প্রার্থী সংখ্যা অত্যন্ত কম। মোট ১ হাজার ৮৪২ জন বৈধ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ২৬ জন নিজেদের একমাত্র পেশা হিসেবে রাজনীতির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে বিএনপির ৪ জন, জামায়াতের ৩ জন এবং জাতীয় পার্টির ১ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২ জন এবং বাকি ১৬ জন অন্যান্য দলের। এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি ও খেলাফত আন্দোলনের কোনো প্রার্থীই রাজনীতিকে একমাত্র পেশা হিসেবে উল্লেখ করেননি।
ব্যবসায়ীদের পর সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন শিক্ষক পেশার প্রার্থীরা। মোট ২৪৪ জন শিক্ষক প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতের ৮০ জন, ইসলামী আন্দোলনের ৭২ জন এবং খেলাফত মজলিসের ২৩ জন রয়েছেন। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও এবি পার্টি থেকে ৪ জন করে শিক্ষক প্রার্থী হয়েছেন। এনসিপি ও খেলাফত আন্দোলনের ৩ জন করে প্রার্থী শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।
আইনজীবী পেশার প্রার্থী রয়েছেন ২০৮ জন। এর মধ্যে জামায়াতের ৩৫ জন, বিএনপির ২৫ জন, জাতীয় পার্টির ২৩ জন এবং স্বতন্ত্র ১২ জন। কৃষিজীবী প্রার্থী মোট ৯৭ জন, যেখানে জামায়াতের সংখ্যা সর্বাধিক ১২। চিকিৎসক পেশায় যুক্ত ৪৮ জন প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতের ১৩ জন এবং বিএনপির ১০ জন রয়েছেন।
সাবেক সরকারি কর্মচারী হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন ২১ জন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির সংখ্যা বেশি—৫ জন। পরামর্শক পেশায় যুক্ত প্রার্থী রয়েছেন ১৩ জন, যাঁদের মধ্যে এনসিপির প্রার্থী সবচেয়ে বেশি।
এ ছাড়া একাধিক পেশার সঙ্গে যুক্ত বহু প্রার্থী রয়েছেন—ব্যবসা ও কৃষি, ব্যবসা ও শিক্ষকতা, ব্যবসা ও আইন, রাজনীতি ও ব্যবসাসহ নানা সমন্বয়ে। আরও ২৫৮ জন প্রার্থী গৃহশিক্ষকতা, বেসরকারি চাকরি ও অন্যান্য পেশার কথা উল্লেখ করেছেন। কয়েকজন নিজেদের পেশা হিসেবে গৃহিণীও উল্লেখ করেছেন।
এই প্রবণতা নিয়ে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদ সদস্য হওয়াকে এখন অনেকেই লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ব্যবসায়ীদের বেশি প্রার্থী হওয়া ক্ষমতার সঙ্গে ‘মুনাফার’ ধারণা যুক্ত হওয়ারই প্রতিফলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা বাস্তবতা হলেও সংসদে এক শ্রেণির আধিপত্য গণতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাঁর ভাষায়, সংসদ হওয়া উচিত সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিচ্ছবি।