
শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ শুরু হওয়া পাইলট কর্মসূচিতে যশোর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও নড়াইলের ছয়টি উপজেলার ৯১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৬১ শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে শিক্ষার্থীদের সিদ্ধ ডিম, ফোর্টিফাইড বানরুটি ও পাকা কলা দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এই উদ্যোগ শুধু শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করছে না, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও ভর্তির আগ্রহ বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে।
এর আগে ২০১১ সালে মাত্র ৫৫ হাজার শিশুকে নিয়ে শুরু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি এক দশকে ১০৪টি উপজেলার ১৫ হাজার ২৮৯টি বিদ্যালয়ের ৩০ লাখ শিশুর কাছে পৌঁছেছিল। ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ওই কর্মসূচিতে প্রায় ৫৮ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল, যার ৭৫ শতাংশ ছিল সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন।
বর্তমান কর্মসূচিতে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় অংশীজনদের অভিজ্ঞতায় বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি, নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে আগ্রহ সৃষ্টি, ঝরে পড়ার প্রবণতা কমা এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বৃদ্ধির মতো ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে টিফিনের সময় অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতাও কমছে।
তবে দুর্গম ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় খাবার সরবরাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কোথাও কাঁচা সড়ক, কোথাও নদীপথ ব্যবহার করে খাবার পৌঁছে দিতে হচ্ছে। গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৩০টি বিদ্যালয়ে কখনো পিকআপ, আবার কখনো ট্রলার ব্যবহার করে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ ধরনের এলাকায় স্থানীয় কৃষক ও খামারিদের কাছ থেকে ডিম, কলা ও দুধ সংগ্রহের মাধ্যমে ‘হোম-গ্রোন স্কুল ফিডিং’ মডেল বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবহন ঝুঁকি কমার পাশাপাশি খাবার তুলনামূলক তাজা রাখা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসূচির অর্থ ধরে রাখার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বর্তমান কর্মসূচিতে আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য খাবার বরাদ্দ থাকলেও কোনো কোনো বিদ্যালয়ে বাস্তব উপস্থিতি তার চেয়ে বেশি। ফলে শিক্ষককে খাবার ভাগ করে দিতে হচ্ছে। এ কারণে বাস্তব উপস্থিতির সঙ্গে খাবারের বরাদ্দ দ্রুত সমন্বয় করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি মান নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় স্কুল মিল নীতি ২০১৯ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের খাবারে ৩ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর দৈনিক ক্যালরি চাহিদার অন্তত ৩০ শতাংশ এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ অণুপুষ্টি, আমিষ ও চর্বি থাকা প্রয়োজন। বর্তমান খাদ্যতালিকা এই মানদণ্ড কতটা পূরণ করছে, তা নিয়মিত প্রকাশ ও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচির গুরুত্ব বেশি। পুষ্টিকর খাবার শিশুদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের ওপর থাকা অর্থনৈতিক চাপও কিছুটা কমাতে পারে।
তবে পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দিতে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। উপস্থিতি, ঝরে পড়া, ভর্তি, পুষ্টিগত অবস্থা, শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ ও শিখনফলের পরিবর্তন পরিমাপ করতে হবে। পাশাপাশি খাবারের মান ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধীরে ধীরে শতভাগ শিক্ষার্থীকে কর্মসূচির আওতায় আনা। পাশাপাশি খাবারের মান নিশ্চিত করা, দুর্গম এলাকায় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, স্থানীয় তদারকি বাড়ানো এবং নিয়মিত প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ একটি ডিম, একটি কলা কিংবা একটি পুষ্টিকর বানরুটি শুধু খাবার নয়—একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা ও শিক্ষায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হতে পারে।