
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আবারও নিজেদের পুরনো অবস্থান সামনে এনেছে মিয়ানমার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।
শনিবার দেওয়া ওই বিবৃতিতে মিয়ানমার দাবি করেছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া যাচাই হওয়া তিন লাখের কিছু বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে তারা ফেরত নিতে প্রস্তুত। তবে বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছে, তার সংখ্যা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি মিয়ানমারে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।
মিয়ানমারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আরসার হামলার পর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় বিপুলসংখ্যক ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে চলে যায়। দেশটির হিসাবে ওই সময় প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এই তথ্যের ভিত্তিতে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্যও তারা অস্বীকার করেছে।
বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করেছে দেশটি। আরও ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই হওয়া সাবেক বাসিন্দাদের ফেরত নেওয়া হবে। তবে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিয়ানমারের এই অবস্থানকে নতুন কিছু হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা পরিচয় অস্বীকার করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে মিয়ানমার। অতীতেও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার কথা বলে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করার অভিযোগ উঠেছিল দেশটির বিরুদ্ধে।
২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আগের ও পরবর্তী সময়ে আসা শরণার্থীদের যুক্ত করলে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং পরিচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সমাধান না হওয়ায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের সর্বশেষ বিবৃতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে আবারও সক্রিয় করতে পারে। তবে বাস্তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না এবং তা কতটা নিরাপদ ও টেকসই হবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত। পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে মিয়ানমারের অবস্থান পরিবর্তন না হলে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ কতটা এগোবে, তা নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন।