
গরম গরম জিলাপি বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি মিষ্টি। সকালের নাশতা, বিকেলের আড্ডা, রমজানের ইফতার, ঈদ-পূজা কিংবা বিয়ের আয়োজন—বিভিন্ন উপলক্ষে এই মিষ্টির উপস্থিতি দেখা যায়। মুচমুচে বাইরের স্তর আর চিনির রসে ভেজা ভেতরের অংশের কারণে জিলাপি ছোট-বড় সবার কাছেই জনপ্রিয়।
তবে বহুল পরিচিত এই মিষ্টির ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। অনেকের ধারণা, জিলাপি ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব সৃষ্টি। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র বলছে, এর আদি উৎস আরও পশ্চিমে, পশ্চিম এশিয়ায়।
ইতিহাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় ‘জালাবিয়া’ বা ‘জুলাবিয়া’ নামে এক ধরনের ভাজা মিষ্টির প্রচলন ছিল। এটিকেই আধুনিক জিলাপির পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দশম শতাব্দীর আরবি রান্নার বই ‘কিতাব আল-তাবিখ’-এ এই ধরনের মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময় ত্রয়োদশ শতাব্দীর আরেকটি আরবি রান্নার বইয়েও এর প্রস্তুতপ্রণালির বর্ণনা পাওয়া যায়।
বাণিজ্য, ভ্রমণ এবং বিভিন্ন সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে জালাবিয়া বা জুলাবিয়া ধীরে ধীরে পারস্য হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছায়। প্রায় ১৫শ শতাব্দীর জৈন সাহিত্য ‘প্রিয়ঙ্করূপকথা’-তেও জিলাপির উল্লেখ পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
উপমহাদেশে আসার পর স্থানীয় উপকরণ ও রুচির সঙ্গে মিলিয়ে জিলাপি বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন রূপ পায়। পশ্চিমবঙ্গে এটি ‘জিলিপি’ নামে পরিচিত। আবার ছানার জিলাপি ও মুগের জিলাপির মতো ভিন্ন সংস্করণও রয়েছে। দক্ষিণ ভারতে ‘জাঙ্গিরি’ এবং উত্তর ভারতে ‘ইমারতি’ দেখতে জিলাপির কাছাকাছি হলেও তৈরির উপকরণ ও পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশেও অঞ্চলভেদে জিলাপির আকার, পুরুত্ব ও স্বাদে বৈচিত্র্য দেখা যায়। কোথাও পাতলা ও মুচমুচে জিলাপি জনপ্রিয়, আবার কোথাও বড় ও মোটা জিলাপির চাহিদা বেশি।
অর্থাৎ জিলাপির শিকড় পশ্চিম এশিয়ায় হলেও শত শত বছরের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় এটি দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তাই জিলাপির ইতিহাসকে শুধু একটি দেশের খাবারের ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতির দীর্ঘ আদান-প্রদানের গল্প হিসেবেই দেখা যায়।